September 26, 2018

উপমহাদেশের এক ভয়ংকর বিস্মৃত অধ্যায়—ঠগী

--- ৬ জুন, ২০১৪

মাসুদ আমিন।। ঠগীরা ছিল ভারতবর্ষের একটি বিশেষ Cult বা খুনী উপাসক সম্প্রদায়।ভারতবর্ষের কালীসাধকদের একটি ক্ষুদ্র অংশ কালীসাধনার ভ্রান্ত ব্যাখ্যায় পথভ্রষ্ট হয়ে খুনি হয়ে উঠেছিল। এদের মতন নিষ্ঠুর আর নিপুণ খুনীর দল পৃথিবীতে বিরল। ঠগীরা যত মানুষ হত্যা করেছে পৃথিবীর ইতিহাসে তা নজিরবিহীন।
কেবল ১৮৩০ সালেই ঠগীরা প্রায় ৩০,০০০ মানুষ হত্যা করেছে। বাংলা অভিধানে ঠগী বলতে বোঝায় বিশেষ শ্রেনীর দস্যুদল যারা পথিকের গলায় রুমাল
বা কাপড় জড়িয়ে হত্যা করে। ঠগী শব্দটি সংস্কৃত ঠগ শব্দ থেকে এসেছে। ঠগীরা তেরো শতক থেকে উনিশ শতক বাংলাসহ উত্তর ভারতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। ঠগীদের সম্বন্ধে ব্রিটিশ সরকার প্রথম জানতে পারে ১৮১২ সালে । তখন গংগা নদীর পাড়ে একটি গণকবরে ৫০ টি মৃতদেহ পাওয়া যায় । গণকবরটি পরীক্ষা করে দেখা গেল যে মৃতদেহগুলি যাতে ভালো করে মাটির সঙ্গে মিশে যায় সে জন্য সুচতুর কৌশলের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে এবং হাড়ের জোড়াগুলি ভেংগে দেওয়া হয়েছে, যাতে করে ডিকম্পোজিশন দ্রুত হয় এবং  কবর ফুলে না ওঠে। সবকিছু বিচারবিশ্লেষণ করে ব্রিটিশরাজ সিদ্ধান্তে আসে যে এই  গণহত্যার পিছনে রয়েছে খুনে cult। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে ঠগী নামে খুনে এক উন্মাদ গুপ্ত ধর্ম্মীয় গোষ্ঠীর কথা। এরা ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়ায়, যাত্রীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে। তারপর সময়
সুযোগ বুঝে গলায়  রুমাল বা কাপড় পেচিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করে তারপর গোপনে মৃতদেহ সমাহিত করে।এরা যেভাবে লাশ গুম করতো তা শিল্পের পর্যায়ে পরে।সে কারণে কেউ ঠগীদের আক্রমনে মারা গেলে বিষয়টি অজানা থেকে যেত। লোকে ভাবতো পথিমধ্যে জন্তুজানোয়ারের আক্রমনের শিকার হয়েছে। ঠগীরা কেবল সনাতন ধর্মেরই অনুসারী নয়, এদের মধ্যে মুসলিম ও শিখও ছিল। ঠগীরা বংশপরম্পরায় খুন ও দস্যুবৃত্তি করত। ছোটবেলা থেকেই ঠগী পিতা ছেলেকে শেখাত কীভাবে শ্বাসরোধ করে ফাঁস দিয়ে হত্যা করতে হয়। ঠগী বালকের শিক্ষা শুরু হত দশ বছর বয়েসে । তখন সে লুকিয়ে হত্যাকান্ড দেখত। বয়স ১৮ হলে হত্যার অনুমতি পেত। সাধারণত শক্ত কাপড়ের তৈরি হলুদ রঙের রুমাল  গলায় পেচিয়ে হত্যা করা হত। হলদে রুমাল থাকত ঠগীদের কোমড়ে । ওরা বলতো পেলহু,প্রান্তে বাধা থাকতো সিদুর মাখান
টাকা, ওটাকে আরও নির্ভুল আরও নিখুত করার জন্য। ঠগীদের আদিপিতা নাকি কালীর কাছে শিখেছিল ফাঁস দিয়ে হত্যার রক্তপাতহীন এই পদ্ধতি।কারন কালীর আদেশ ছিল রক্তপাত ঘটানো যাবেনা। মৃতদেহ উৎসর্গ করা হত কালীকে আর লুঠের মাল ভাগ করে নেয়া হতো।
ঠগীরা ব্যবসায়ী, তীর্থযাত্রী কিংবা সৈন্যের ছদ্মবেশে ভ্রমন করত। এদেরই লোকজন গোপনে বাজার কিংবা সরাইখানা থেকে পথযাত্রীদের সম্বন্ধে যাবতীয় তথ্য
যোগার করত। তারপরে যাত্রীদের সংগে মিশে যেত। যাত্রাবিরতিতে হত্যাকান্ড ঘটাত। একজন যাত্রীকে খুন করত তিনজনের একটি দল। একজন মাথা ধরে রাখতো,অন্যজন ফাঁস পরাত, আরেকজন পা চেপে ফেলে দিত। কেউ পালিয়ে গেলেও রক্ষা নেই, ঠগীদের অন্যদলটি কাছেপিঠেই ওত পেতে থাকত। তবে ঠগীরা  ফকির সংগীতজ্ঞ নৃত্যশিল্পী ঝাড়ুদার তেল বিক্রেতা কাঠমিস্ত্রী কামার বিকলাংগ কুষ্ঠরোগী গংগাজলবাহক ও নারীদের হত্যা করতো না। তবে ব্যবসায়ীদের স্ত্রীদের হত্যা করতো। ঠগীরা প্রায় ২০ লক্ষ মানুষ হত্যা করে,যা অকল্পনীয়। অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতকে ঠগীদের হত্যাকান্ড তুংগে উঠে। অনুমান করা হয় ঠগীরা  ১২৯০ সালের পর বাংলায় আসে। ১৩৫৬ সালে ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দীন বারানি, ফিরোজ শাহর ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন: ‘…উক্ত সুলতানের শাসনামলে (১২৯০) কয়েকজন
ঠগীকে দিল্লিতে আনীত হইয়াছিল এবং উক্ত ভ্রাতৃসংঘের একজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করিয়া আরও সহস্র ঠগীকে আটক করা হয়। সুলতান তাহাদের হত্যার নির্দেশ দেন নাই। সুলতান উহাদিগকে নৌকায় করিয়া লক্ষণাবতীতে পাঠাইয়া দিতে নির্দেশ দেন যেন তাহারা আর দিল্লিতে গোলযোগ না করতে পারে। লক্ষণাবতী হল গৌড়
বাংলা। যা অবস্থিত ছিল বর্তমান পশ্চিম বাংলার মালদাহ জেলায়। বাংলায় ঠগীদের ইতিহাসের সূত্রপাত সম্ভবত এখান থেকেই। উনিশ শতকের প্রথমার্ধে ভারতবর্ষে রেল
যোগাযোগ স্থাপিত হচ্ছিল। যাত্রীরা পায়ে হাটার বদলে রেলে ভ্রমন করতে শুরু করে। ফলে ঠগীদের দৌরাত্ম কমে আসছিল। তারপরও বিভিন্ন স্থানে পাওয়া যাচ্ছিল গণকবর। ব্রিটিশ সরকার ঠগীদের নিমূর্ল করার জন্য উইলিয়াম শ্লিমান কে দায়িত্ব দেয়। ১৮২২ সালে উইলিয়াম শ্লিমান বেঙ্গল আর্মির অফিসার ছিলেন।  তাকেই
গর্ভনর জেনারেল লর্ড বেনকিট  ঠগীদের নির্মূল করার নির্দেশ দেন। উইলিয়াম শ্লিমান অত্যন্ত বিচক্ষণ ব্যাক্তি ছিলেন, চারটি ভারতীয় ভাষা জানতেন।তিনি জানতেন ঠগীদের দমন করা সহজ না। কেননা, অন্যান্য দুস্কৃতিকারীদের থেকে ঠগীদের আলাদা করা যাচ্ছিল না। তাছাড়া এরা নিপুণ কৌশলে অপরাধ ঢেকে রাখছিল। উইলিয়াম শ্লিমান গুপ্ত চর নিয়োগ করেন, গঠন করেন বিশেষ পুলিশ বাহিনী ও আলাদা বিচার আদালত।এরই পাশাপাশি উইলিয়াম শ্লিমান ঠগীদের অপরাধস্থল সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষন করে মানচিত্র তৈরি করেন এবং অপরাধের দিনক্ষণের একটি তালিকা তৈরি করেন,যার ফলে তিনি পরবর্তী গণহত্যার সময়কাল আচ করতে সক্ষম হন।
নিজের লোকদের ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে অস্ত্রসহ পাঠান। এভাবে ১৮৩০ থেকে ১৮৪১ সালের মধ্যে ৩, ৭০০ ঠগী ধরা পড়ে। জিজ্ঞাসাবাদের ফলে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য
বেরিয়ে আসে। যেমন মাত্র ২০ জনের দল ৫,২০০ পথযাত্রীকে হত্যা করেছে । ঠগী সর্দার বেহরাম ছিল সিরিয়াল খুনী। সে ১৭৯০ থেকে ১৮৩০ সাল এর মধ্যে ৯৩১ টি খুন করে। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা হয় কি না। উত্তরে সে নির্বিকার চিত্তে বলেছিল, ব্যবসার জন্য কে আক্ষেপ করে।৫০ জন
ঠগীকে গোপন তথ্যাদি দেওয়ায় ক্ষমা করা হয়। অনেকের হয় যাবজ্জীবন কারাদন্ড। ৫০০ ঠগীকে ঝোলানো হয় ফাঁসীতে। ফাঁসীকাষ্ঠে ঠগীরা ছিল অভিব্যক্তিশূণ্য।
তারা কর্তৃপক্ষের কাছে ফাঁস পরিয়ে মৃত্যুর আবেদন করে যে ভাবে তারা হত্যা করত।

ফেইসবুকে আমরা

পুরনো সংখ্যা

সেপ্টেম্বর ২০১৮
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« আগষ্ট    
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০