November 14, 2018

এক যুগ পর কেন মেজর হাফিজের বিচার চান এমপি শাওন !

--- ৩০ এপ্রিল, ২০১৩

লিটন বাশার ॥ ভোলা-৩ আসনের সংসদ সদস্য নূর নবী চৌধুরী শাওন সংখ্যা লঘু নির্যাতনের ঘটনার এক যুগ পর কনভেনশনের নামে সাবেক বিএনপি দলীয় মন্ত্রী মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদ (বীর বিক্রম) এর বিচার দাবী করেছেন। গত শনিবার লালমোহনে কনভেনশনের নামে আওয়ামী লীগ নেতাদের নিয়ে এমপি শাওন তার নির্বাচনী এলাকা লালমোহন- তজুমদ্দিনের হিন্দু সম্প্রদায়কে জড়ো করার চেষ্টা করেন। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর নির্যাতিতরা এমপি’র এ কথিত কনভেনশনে না এলেও রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের পথটি পুরন হয়েছে এমপি সাহেবের। ২০১০ সালের এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত উপ- নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসাবে এমপি নির্বাচিত হন শাওন। কিছু দিনেইর মধ্যে সংসদ ভবন এলাকায়  যুবলীগ নেতা ইব্রাহিম খুন সহ নানান কারনে -অকারনে ব্যাপক সমালোচিত হয়ে উঠেন সরকারী দলীয় এই তরুন সাংসদ। অল্প বয়সেই রাজনীতিতে পটু  হয়ে উঠা এ সাংসদ কনভেনশনটি রাজনৈতিক আদলে করে নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করছেন মাত্র। তিনি এক ঢিলে দুই পাখি মারার মতই কৌশলী ভূমিকা পালন করেছেন। ইব্রাহিম খুন ও টেন্ডারবাজী সহ নানান কারনে কেন্দ্রের কাছে নড়বড়ে অবস্থানকে শক্ত করার তরিকা হিসাবে হয়তো দলের এখন অন্যতম ক্ষমতাধর যুগ্ম সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফকে প্রধান অতিথি হিসাবে অনুষ্ঠানে হাজির করতে সক্ষম হয়েছে।  একই সাথে আগামী নির্বাচনে সংখ্যা লঘুদের ভোট ব্যাংক ঠিক রাখতে এ কনভেনশন সহায়ক ভূমিকা পালন করবেন বলে হয়তো মনে করছেন এমপি শাওন। নির্বাচনকে সামনে রেখেই তার এ কথিত কনভেনশন ঢেকে সংখ্যা লঘু সম্প্রদায়ের প্রতি দরদ দেখানোর একটি রাজনৈতক কৌশল বলেই মনে করছি।
পাঠক মাত্রই প্রশ্ন করতে পারেন আমার এখানে মনে করার কি আছে? অথবা আমি কি মনে করলাম তাতে লালমোহন- তজুমদ্দিন বাসীর কি আসে যায়! তাই ফিরতে হচ্ছে এক যুগ আগের  স্মৃতির পাতায়।
ফ্লাশ ব্যাক

২০০১ সাল । তারিখটি ছিল ১ অক্টোবর। সন্ধ্যার কালো অন্ধকার ঘনিয়ে আসার সাথে সাথেই এক যোগে সারাদেশে সংখ্যালঘুদের জন্য রাতের অন্ধকার যেন আরো কালো হয়ে রাজত্ব গেরে বসে। বিশেষ করে যুবতী, কিশোরী, তরুনী থেকে শুরু করে পঙ্গু গৃহবধু কিংবা বউ শাশুড়ী এক যোগে ধর্ষনের শিকার হলো।  দেশের গাঙ্গেয় অববাহিকার দ্বীপজেলা ভোলার সংখ্যালঘুদের একটি বিশাল জনগোষ্টির আবাস স্থল হচ্ছে লালমোহনে। এ উপজেলার লর্ড হার্ডিঞ্জ, চর অন্নদা প্রসাদ, ফতেমাবাদ, রায় চাদ, পেয়ারী মোহন সহ বেশ কয়েকটি গ্রামের সিংহ ভাগ মানুষই হিন্দু সম্প্রদায়ের। তাই তাদের  সংখ্যালঘু বলা চলে না। তাতে কি? বিজয়ের আনন্দ যখন বিএনপি’র ঘরে ঘরে তখন এ সব গ্রামের মানুষদের বিশেষ করে নারী সম্প্রদায়ের সম্ভ্রম রক্ষায় পালাতে হলো। কিন্ত পালিয়ে রক্ষা পাওয়া গেল না। যে গ্রাম গুলোর কথা বললাম তা  উপজেলা সদর থেকে এতটাই দূরত্ব যে ঐ সব গ্রামের মানুষ খুব সহজে উপজেলা সদরে আসেন না।

মা-মেয়ে শাশুড়ি-পুত্র বধু পর্যন্ত
উপজেলা সদর থেকে বহুদুরের ছায়াঘেরা সবুজ বেষ্টনীতে ঘিরে রাখা ইউনিয়নটির নাম লর্ড হাডিঞ্জ। বৃটিশ উচ্চ পদস্থ এক কর্মকর্তার নামেই এ ইউনিয়নের নাম রাখা হয়। ইউনিয়নের কাচা মাটির রাস্তা ধরে এগুলোই  গ্রামের মাঝে ছোট্ট একটি বাজারে নাম জিএম বাজার।  পাশেই জিএম স্কুল। এই স্কুলের প্রতিষ্টাতা গুনমনি হালদার ছিলেন একজন সত্যিকারের গুনী শিক্ষক। ১৭ বছর  ইউপি চেয়ারম্যান ছিলেন প্রিয় লাল নামের একজন বিশিষ্ট ধর্ণাঢ্য ব্যক্তি। তারপর চেয়াম্যান হয়েছিলেন দাশরত বাবু। এ সব গুনীজনকে  নিয়ে রয়েছে বিশাল ইতিহাস। সেই ঐহিত্যের সোনার খাটি মানুষ গুলোর গ্রামেই কলংকের তিলক একে দিল  হায়নার দল। ভয়াল রাতে আশ্রয় নিয়ে ছিল গ্রামের মধ্যবর্তী ভেন্ডার বাড়িতে। দ্বীপ জেলা ভোলা বা মনপুরা উপজেলার মতই এ বাড়িটির চারদিকে পানি থাকায় নিজেদের নিরাপদ মনে করেছিল নারীরা। কিন্ত হাটু সমান পানি আটকে রাখতে পারেনি ধর্ষকদের। তারা দল বেধে উল্লাস করে ছুটলো ভেন্ডার বাড়িতে। সভ্যতার সকল সীমা লংঘন করে বর্বরতার মুখোশ উম্মোচিত হলো। মা, মেয়ে, শাশুড়ি ও পুত্র থেকে শুরু করে নাতনীর বয়সী কিশোরী পর্যন্ত
রেহায় পেল না।   এই বাড়ির ধর্ষনকারীদের নেতৃত্বে ছিলেন স্থানীয় ইয়াছিন মাষ্টারের দুই ছেলে সেলিম ও বেল্লাল। এ যেন আইয়ামে জাহিলিয়াতের যুগ।  সহোদর মিলে ধর্ষন করলো এ বাড়ীতে আশ্রয় নেওয়া ছোট্ট শিশু রিতাকে। বয়স্করা ধর্ষনের বিষয়টি অনেকেই চেপে গেলেও রিতা অসুস্থ হয়ে পরায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। জাতীয়তাবাদী আতংকের মাঝেই ধর্ষনের গুঞ্জন ভোলা সদর পর্যন্ত আমাদের কানে চলে আসে।
 প্রথম আলো ও জনকন্ঠ
 
জাতীয়তাবাদীর শক্তির অশুভ আতংকের মাঝে কে কার খবর নেয়। জেলা শহর গুলোতে এখনো সাংবাদিকতা পেশাদারিত্ব রুপ না নেওয়ায় পাশাপাশি সাংবাদিকদের দলীয় রাজনীতির লেজুড়বৃত্তির কারনে তারা নির্বাক। জাতীয়তাবাদী আর্দশের মধ্যে শুভ বুদ্ধির বা মুক্ত চিন্তার চর্চা করেন তারাও যেন মুখে কুলুপ এটেছেন। আর যারা আওয়ামী লীগের পরাজিত সৈনিক তারা অনেকটা গৃহবন্দী। আওয়ামী লীগের নেতাদের ভোট ব্যাংকের কি মূল্য আছে ভোটের পরদিন। তারা বরং বিএনপি দলীয় আতœীয় স্বজন ও শুভাকাংঙ্খীদের সাথে গোপন যোগাযোগ রেখে নিজের ব্যবসা – বানিজ্যের দিকেই মনযোগী হয়ে উঠেন। আর ১২ বছর পর কনভেনশনের আয়োজক বর্তমান সাংসদ নূর নবী চৌধুরী শাওনকে তখন এ সব হিন্দু সম্প্রদায়ের কেউ চিনতো কি না তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। যতটা জানি তখন শাওন যুবলীগের রাজনীতিতে ক্যারিয়ার গড়ার জন্য ঢাকায় ক্যাডার হিসাবেই ব্যস্ত ছিলেন। বিভিষিকাময় সেই দিন ক্ষনে শাওনদের পা পরেনি ভোলার মাটিতে। তখন প্রথম আলোর ভোলা প্রতিনিধি ছিলেন ফরিদ হোসেন বাবুল ভাই। রণাঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধের সাহসী মানুষটি আজ বেচে নেই। এক যুগ আগে যে স্মৃতির পাতায় বাবুল ভাইকে দেখেছি তাতে চুল পাকা মোটা ফ্রেমের চশমা পরা তিন সন্তানের জনক বয়স ভারী একজন মানুষ। তার প্রেরনায় সেদিন ছুটেছিলাম লর্ড হাডিঞ্জ ইউনিয়নের গ্রাম গুলোতে। শুধুই কি ভেন্ডার বাড়ির ধর্ষনে সীমাবদ্ধ ছিল জাতীয়তাবাদী সৈনিকরা। তারা ফতেমাবাদ গ্রামের শাশুড়ি বিষ্ণু প্রিয়া ও পুত্র বধু সুজাতাকে একত্রে ধর্ষন করে। ছেলের  বয়সী দুর্বৃত্তের হাতে মায়ের বয়সী নারীকে ধর্ষনের বর্ননা শুনে কিং কর্তব্য বিমূঢ় হয়ে গেলাম। লম্পটদের কাছে আকুতি করে নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি মায়ের বয়সী  পঙ্গু শেফালী । মেঘনার টিপ হিসাবে পরিচিত দ্বীপ জেলা ভোলার নির্বাচনোত্তর কলংকময় অধ্যায় জাতির সামনে উপস্থাপনের জন্য আমাদের সাথে যোগ দিলেন পর্যায় ক্রমে প্রথম আলোর তৎকালীন সিনিয়র রিপোর্টার গোলাম কিবরিয়া ও বর্তমান ভ্রাম্যমান প্রতিনিধি রাজীব নূর এবং জনকন্ঠের তৎকালিন স্টাফ রিপোর্টার ( বর্তমানে এটিএন বাংলার সিনিয়র রিপোর্টার) শওকত মিলটন।
শুধু লালমোহন নয়  নিয়ে চষে বেড়িয়েছি চরফ্যাশনের নুরাবাদ ইউনিয়নের উজালা ও ক্ষুধীরামের বাড়ি থেকে কুঞ্জের হাট, বোরহান উদ্দিন , দৌলতখানের চরপাতা সহ গ্রামের পর গ্রাম।
জনকন্ঠ ও প্রথম আলোর পাতায় উঠে আসলো ভূলন্ঠিত মানবতার কথা।
সেই দিন এই দিন
 সেদিনের খবর পড়ে মানবাধিকার সংগঠন গুলো ছুটতে শুরু করলো লালমোহনের উদ্দেশ্যে। ড. কামাল হোসেন, সুলতানা কামাল, প্রফেসর ড. অজয় রায়, পংকজ ভট্টচার্য্য, রাখী দাস পুরকায়স্থ সহ বিশিষ্ট জনরা। আইন ও শালিস কেন্দ্র এবং গণ স্বাক্ষরতা অভিযানের পক্ষ থেকে ভিডিও ডকুমেন্টারী তৈরী করা হয়। মানবাধিকার সংগঠন গুলোর সাথে ভোলা থেকে এবার যুক্ত হন সংবাদের তৎকালীন সাংবাদিক মোবাশ্বের উল্লাহ চৌধুরী। তিনি সারা জীবন বাম রাজনীতি করে গেছেন। লোভ – লালসার উর্ধ্বে থাকা এ মানুষটি দিনের পর দিন আমাদের সফর সঙ্গী হয়েছেন। কিন্ত লালমোহনের সেই দুর্গম পথ তখন আর আমার জন্য নিরাপদ ছিল না। পুলিশ বরাবরই শাসক দলের চাকর হিসাবে আইনের প্রয়োগ ঘটায়। তখন বিএনপি ক্যাডারদের চেয়েও লালমোহন থানা পুলিশ বেশী ক্ষুদ্ধ আমার উপর। যদিও তৎকালীন পুলিশ সুপার শাহজামান রাজ একজন ভাল মানুষ হওয়ার কারনে নিজেকে কিছুটা নিরাপদ মনে করতাম। তবে ততদিনে লর্ড হার্ডিঞ্জের মাস্তানরা ক্ষেপে গেছেন আমার বিরুদ্ধে। অনেকটা মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেই আমাদের লালমোহন যাতায়াত। গোপনীয় এ সফরের মাঝে একদিন টের পেয়ে যান তজুমদ্দিনের বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা মোশারেফ হোসেন দুলাল। তিনি ড.কামাল হোসেনের আগমনের খবর পেয়ে সন্ধ্যায় ভোলা খেয়াঘাটের ঢাকাগামী  লঞ্চে এসে হাজির। বিশাল খাবার-দাবারের অনেক গুলো বাটি নিয়ে তিনি ড. কামাল হোসেনের কক্ষে প্রবেশ করে বললেন ‘ স্যার আপনার রাতের খাবারটা আমার বাসা থেকে তৈরী করে এনেছি। রাতে আপনি লঞ্চে খাবেন’। দুলাল ভাইরা মনে প্রানে সেদিন ড. কামালদের সাধুবাদ জানিয়েছেন। হিন্দু সম্প্রদায়কে রক্ষার জন্য সুলতানা কামালদের কার্যক্রম তাদের খুবই পচ্ছন্দের বলে চোখের ভাষায় বুঝেছি। কিন্ত আজ সেই মোশারেফ হোসেন দুলাল ভাইর এলাকায় উড়ে এসে জুড়ে বসা এমপি সাহেব কি সংখ্যা লঘু নির্যাতনের অতীত ইতিহাসের সিংহভাগও জানেন? নাকি সামনে নির্বাচন তাই প্রতিদ্বন্দি প্রার্থী মেজর হাফিজের বিচার দাবী করতে কনভেনশনের নামে আওয়ামী আয়োজনে পুনরায় সংখ্যালঘুদের আরেকটি রাজনৈতিক নির্বাচনে ব্যবহারের পায়তারা করছেন। ……..চলবে

ফেইসবুকে আমরা

পুরনো সংখ্যা

নভেম্বর ২০১৮
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« অক্টোবর    
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০