November 13, 2018

কবি’র প্রতি আমাদের এ কেমন অবহেলা !

--- ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

লিটন বাশার ॥গাঙ্গেয় অববাহিকার জেলা থেকে বিভাগীয় শহরে রুপ নেওয়া দু’শ বছরের পুরানো এই শহর যাদের অচেনা সেই সব মানুষরাও জীবনানন্দ দাশের লেখার সাথে অতি পরিচিত। বরিশালে পা রাখেননি এমন রোমান্টিক প্রেমিক জুটিকেও দেখেছি জীবনানন্দ দাশের লেখার সংলাপের মাধ্যমেই ঘন্টার পর ঘন্টা অনায়াসে কথা বলে যাচ্ছেন। তারা বরিশালকে জীবনানন্দের শহর সম্মোধন করতেই সাচ্ছন্দ বোধ করেন। যদিও পুরো বাংলাদেশের রুপের সাথেই জড়িয়ে আছেন জীবনানন্দ দাশ। তিনি রূপসী বাংলার কবি। গানের ভাষায় এই রুপসী বাংলা জীবনানন্দের। তিনিই বাংলার রুপ লাবন্য ও যৌবনের উর্বরা শক্তিকে সুন্দর সাবলিল ভাষায় উপস্থাপন করে গেছেন।
গত কয়েক দিন আগেই খবর পেয়েছিলাম জীবনানন্দ দাশের জন্ম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে তিন দিনব্যাপী এবার উৎসব অনুষ্ঠিত হবে। নিজে জীবনে কবিতার ‘ক’ অক্ষরটি না লিখলেও কবিতা পাঠে এবং আবৃত্তি শোনার ব্যাপারে আমি একজন খুবই ভাল পাঠক বা শ্রোতা। আর প্রিয় কবিদের তালিকায় নিশ্চয়ই জীবনানন্দ দাশের নামটি শীর্ষ স্থানেই থাকার কথা। সেই হিসাবে প্রিয় কবি’র জন্ম দিনে এমন আয়োজন ভাল লাগারই কথা। গতকাল সোমবার যখন উৎসনের আমন্ত্রন পত্রটি পেলাম তখন চোখে পড়লো এ উৎসবের আয়োজক হচ্ছেন জেলা প্রশাসন। প্রথমই এ উদ্যোগের কারনে জেলা প্রশাসন বিশেষ করে জেলার শীর্ষ কর্তা জেলা প্রশাসক জনাব শহিদুল আলমতে ধন্যবাদ জানাতে হয়। সাধুবাদ জানাচ্ছি তার এ উদ্যোগকে। আর লজ্জিত হচ্ছি নিজে। কারন জীবনানন্দের শহরের বাসিন্দা হিসাবে এ উৎসবের আমন্ত্রন আমার বা আমাদের পাওয়ার কথা নয়। বরং আমাদের আয়োজনে জেলা প্রশাসক সহ অন্যান্য সরকারী কর্মকর্তাদের অতিথি হয়ে আসার কথা ছিল। চাকুরীর সুবাদে আমাদের শহরে যারা জনাব শহিদুল আলমের মত সরকারী দায়িত্ব পালন করতে আসেন তাদেরকে জীবনানন্দের শহরটি এবং কবি ও তার পরিবারের বসত বাড়িটি সহ সব কিছু খুটি নাটি বিষয় গুলো সম্পর্কে অবহিত করা। কিন্ত সবকিছুই যেন উল্টো পথে – উল্টো রথে ঘোরার মত ঘুর্নিপাকে ঘুরছি আমরা। আমারই বাড়িতে অতিথি’র আয়োজন করা অনুষ্টানে আমায় আমন্ত্রন জানালো কি না তা নিয়ে আমরা প্রশ্ন তুলতেও দ্বিধা বোধ করছি না। অথচ এই আমরাই জীবনানন্দ দাশের মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্টান সহ নানান অনুষ্টান আয়োজনে মেতেছিলাম জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে। এ ধারা আমাদের প্রিয় কবি’র ৫৭তম মহা প্রয়ান দিবস পর্যন্ত লক্ষ্য করেছি। কবিতা পরিষদ ও সাংস্কৃতিক সংগঠন গুলোই ২০১০ সাল পর্যন্ত জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্টান আয়োজন করে এই নগরীর বাসিন্দা হিসাবে তাকে স্মরনে রাখতে সাহায্য করেছেন। পরের বছর ছিল কবি’র ৫৮ তম মহা প্রয়ান দিবস। সেই থেকেই লক্ষ্য করলাম জীবনানন্দের প্রতি আমাদের চরম অবহেলা।
রবীন্দ্র নাথের এই নগরীতে আগমন ও নজরুলের প্রাচ্যের ভেনিস নিয়ে আমরা গর্ববোধ করলেও অনেকেই ভূলতে বসেছি জীবনানন্দ দাশের বসত ভিটার কথাও । নগরীর বগুড়া সড়কের মুন্সীর গ্যারেজ হয়ে শীতলাখোলার দিকে রওয়ানা হলেই চোখে পড়ে ‘ধানসিড়ি’ নামের একটি বাড়ি। যদিও বিগত মেয়র প্রয়াত শওকত হোসেন হিরন এ সড়কটির নাম কবি’র নাম অনুসারে জীবনানন্দ দাশ সড়ক দিয়েছিলেন। তাতেও আমাদের আপত্তি! আমরা এখনো বগুড়া রোড হিসাবেই ঠিকানা সম্মোধন করতে পান্ডিত্য দেখাই।
বলতে দ্বিধা নেই কালের বিবর্তনে দ্রুত নগরায়নে অনেক রদ-বদলে ঐতিহ্য হারানোর ধারাবাহিকতায় জীবনানন্দ দাশের বাড়ির ভিতর থেকেও হারিয়ে গেছে প্রাচীনকালের সেই শাল, সিরিজ, আম, জাম, কেওড়া-ঝাড় গাছ । কবি’র পূর্ব পুরুষদের স্মৃতিবাহী মঠগুলোর অস্তিত্বও এখন খুজে পাওয়া যায় না। জীবনানন্দ দাশের সাধের গোলাপ বাগানও কালে-কালে শেষ হয়ে গেছে। প্রায় ৬ বিঘা জমির উপর জীবনানন্দ দাশের বাড়িটি তিন ভাগে বিভক্ত। সিটি কর্পোরেশনের পাম্প হাউজ ও জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গুদাম ঘর ও বাকী জমিতে ক্রমানুসারে বসবাস করছেন আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে ও নাতীরা। পানির পাম্পের একটি অংশে মাত্র কয়েক বছর আগে জেলা পরিষদের উদ্যোগে একটি পাঠাগার নির্মাণ করা হয়েছে। বাকি জমি বেদখল রয়ে গেছে।
এখন কবি’র বাড়ির স্মৃতি চিহ্ন হিসেবে ঘরের দু’টি খুটি ছাড়া আর কিছুই নেই। তারপরও দূর-দূরান্ত থেকে জীবনানন্দ’র ভক্তরা ছুটে আসেন এ বাড়িতে। এসব দর্শনার্থীরা হতাশ হন না। তাদেরকে জীবনানন্দ দাশের বাড়ি হিসেবে সব কিছুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন বর্তমান বাসিন্দা জলিল ফারুক ও তার স্ত্রী-কন্যারা। বাড়িতে ঢুকতেই বাসিন্দাদের কেউ এসে জিজ্ঞাসা করে ‘জীবনানন্দ দাশের বাড়ি দেখতে এসেছেন কিনা’। তারপর বাড়ির শেষ স্মৃতি চিহ্ন হিসেবে দেখিয়ে দেন খুটি দু’টি। জীবনানন্দ দাশের জন্ম নগরীর একটি ভাড়া বাড়িতে। তার পিতা সর্বানান্দ দাস গুপ্ত বরিশাল কালেক্টরিয়েটের একজন কর্মচারী ছিলেন। তিনি ১৯০৭ সালে বগুড়া রোডে জমি কিনে ঐ বাড়িটি নির্মাণ করেন। তখন বাড়ির নাম দেয়া হয়েছিল ‘সর্বানান্দ ভবন’। তার পূর্ব পুরুষরা থাকতেন ঢাকার বিক্রমপুরে। ঐ বাড়িটি কীর্তিনাশা পদ্মায় বিলীন হয়ে যাওয়ায় তা নিয়ে উত্তরসুরীদের কোন স্মৃতি কথা নেই। কিন্তু বরিশালের এ বাড়িটির বর্ণনা দিতে গিয়ে কবি’র ছোট ভাই অশোকানন্দ দাশ লিখেছেন বাড়ির ভিতর ঝোপের মধ্যে কোথায় আনারসের গায়ে হলুদ ছোপ এসেছে, কাঁঠাল গাছের কাঁঠাল কত বড় হোল, কত আম ধরেছে সবকিছুই থাকত জীবনানন্দ দাশের নখদর্পনে। এসব কষতে গিয়ে তিনি কখনো ভুল করতেন না। কবি জীবনানন্দ দাশ ছিলেন বিএম কলেজের ইংরেজীর শিক্ষক। ১৯৪৬ সনের ৮ জুলাই কলেজ থেকে ছুটি নিয়ে তিনি ভারত যান। এর মধ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলে তিনি তার স্মৃতি বিজড়িত এ বাড়িতে ফিরে আসেন নি। জন্মভূমি ও প্রিয় বাড়ি হারানোর কথা একাধিকবার কবিতার ভাষায় প্রকাশ করেছিলেন জীবনানন্দ দাশ। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর তার পিসি ¯েœহ লতা দাস বাড়িটি ছেড়ে কলকাতায় চলে যান। বাড়ি সংরক্ষণের দায়িত্ব এসে পড়ে আশ্রিত লোকদের উপর। পরবর্তীতে আইনজীবী পবিত্র কুমার ঘোষকে কবি’র পরিবারের পক্ষ থেকে পাওয়ার অব এটর্নী প্রদান করা হয়। ১৯৫৫ সালের ৩০ মে ঐ আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। এ পাওয়ার অব এটর্নীর আগেই কালেক্টরিয়েটের কর্মচারী আব্দুর রাজ্জাক সেখানে বসবাস করতেন। কবির পরিবারের সঙ্গে আব্দুর রাজ্জাকের নিবিড় সম্পর্ক ছিল। তিনিই ১৯৬০ সালের ১৭ জুন বাড়ির বেশ কিছু অংশ ক্রয় করেন। কিন্তু পরবর্তীতে বাড়িটির ৭০ ভাগ জমিই সরকার হুকুম দখল করেন। বাকী অংশে আব্দুর রাজ্জাকের দু’ছেলে, ১ মেয়ে ও নাতীরা বসবাস করছেন। এক পর্যায়ে সুশীল সমাজের লোকজন কবির বাড়িটির স্মৃতি রক্ষায় নাম দেয় তার বিখ্যাত কবিতার নামানুসারে ‘ধানসিড়ি’। ঐ বাড়ির বর্তমান বাসিন্দারা জানান- গোলপাতার ছাউনীর যে ঘরটিতে কবি থাকতেন সেটি অযতœ-অবহেলায় বিলীন হয়ে গেছে। আব্দুর রাজ্জাক ষাটের দশকে সেখানে একটি ছাপড়া তোলেন। বর্তমানে সে টিনের ছাপড়াও খুঁজে পাওয়া যাবে না। সেখানে সুরকীর শক্ত দেয়াল ভিত গেড়েছে। নগরীর জন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এ জায়গাটুকু খালি রাখতে কর্তব্য মনে করেননি বাড়ির লোকজন। তাই তারা পাকা টিনশেড ঘর তুলে বসবাস শুরু করেছেন। মূল বাড়ির পিছনে ছিল মাঝারীকৃতির পুকুর। যা এখন ভরাট হয়ে গেছে। বাড়িতে ঢোকার প্রবেশদ্বারে ছিল মঠ ও সমাধি ফলক। সেখানেই এখন সিটি কর্পোরেশনের পাম্প হাউজ ও জীবনানন্দ দাশ পাঠাগার। বাড়ির বামদিকে গড়ে উঠেছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের গুদাম ঘর ও কোয়ার্টার। ১৯৪৬ সালে এখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আদর্শ বালিকা বিদ্যালয়। ১৯৫৮-৫৯ সালে বসত বাড়ির ৪ বিঘা জমি ব্যতীত বাকী সবটুকু হুকুম দখল করে সরকার। বাড়ির ভিতর গাছপালা আশ্রিত সেই আগের মত পরিবেশ না থাকলেও পার্শ্ববর্তী বড় বড় অট্টালিকার পাশে এখনো ব্যতিক্রম বাড়ি হিসেবে এটি দাড়িয়ে আছে। জীবনানন্দ দাসের গোলাপের বাগান না থাকলেও বাড়ির ভিতর ফুলের বাগান আছে। নগরীর জনবহুল এলাকায় ঐ বাড়িটিতে এখনো বেশ কয়েকটি গাছপালা রয়েছে। কিছু রবিশষ্যের চাষও হচ্ছে। জীবনানন্দ দাসের বাড়িটি সংরক্ষণের জন্য এখানকার ২৭টি সাংস্কৃতিক সংগঠনের জোট সম্মিলিত সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদ ১৯৯৯ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকায় গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ পর্যন্ত করেছিলেন। কিন্ত আজ সেই কবি’র জন্ম বাষির্কী কিংবা মৃত্যু বার্ষিকীতে আর অনুষ্টান আয়োজনে সাংস্কৃতিক সংগঠন গুলোর আগ্রহ নেই। মাত্র কয়েক বছরেই কেন জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে আমাদের এই উদাসীনতা এই অবহেলা তৈরী হলো তার উত্তর খুজবো এই তিন দিনের উৎসব আয়োজনের মাঝে।

ফেইসবুকে আমরা

পুরনো সংখ্যা

নভেম্বর ২০১৮
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« অক্টোবর    
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০