September 26, 2018

দূর থেকেই দূরত্বে চলে গেলেন হিরন ভাই

--- ২৯ এপ্রিল, ২০১৪

লিটন বাশার ॥   হে মহান শিল্পী সবারে কাদিয়ে  অসময়ে চলে গেছো মন ভরে দিয়ে। তোমারই এ আসন কভূ হবে না পূরন জানি। আমাদের মাঝে – তুমি রবে চিরদিনই।
চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়- বিচ্ছেদ নয়,
চলে যাওয়া মানে নয় বন্ধন ছিন্ন- করা আর্দ্র রজনী
চলে গেলে আমারও অধিক কিছু থেকে যাবে
আমার না- থাকা জুড়ে।
এ সব কাব্য কথায় হিরন ভাইয়ের মৃত্যুর কোন শান্ত্বনাই খুজে পাচ্ছি না। জানি মৃত্যুর মত চরম নিষ্টুর নিয়তির কাছে আমাদের সকলকেই কখনো না কখনো মাথা নত করতে হবে। কারো রেহাই নেই।  রবীন্দ্রনাথের জনপ্রিয় একটি কবিতা প্রায়ই আমার জীবনের মুখোমুখি হয় ‘সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালবাসিলাম আমি’। প্রায় লেখার মাঝেই এই উদ্ধৃতি টি আমি দিয়ে থাকি বটে তবে এবার কঠিনেরে আর ভালবাসা নয়, কঠিন সত্যকে নিয়তির অমেঘ নিয়মে মেনে নিতে হলো বড় নিষ্টুর নির্দয় ভাবে। মহান রব্বুল আল- আমীন তার পবিত্র কুরআন শরীফে স্পষ্টই বলেছেন ‘ পৃথিবীর সকল প্রানীকেই মৃত্যুর স্বাধ গ্রহন করতে হবে’। কেউ এই স্বাধ গ্রহন থেকে রেহাই পাবেন না।

তবে বরিশালবাসীর প্রান প্রিয় নেতা ক্ষনজন্মা পুরুষটি চরম অসময়ে আকস্মিক এ স্বাধ গ্রহন করে নগরবাসীকে অভিবাবকহীন করে কাদিয়ে চলে গেলেন। তার এ শুন্যতা কখনোই পূরন হবার নয়। যদিও নির্বাচিত সংসদ সদস্য শওকত হোসেন হিরনের বরিশাল সদর আসনটি শুন্য ঘোষনা করে গতকাল সোমবার উপ-নির্বাচনের তফসিল ঘোষনা করেছেন নির্বাচন কমিশন। দুপুরে যখন কমিশন কার্যালয়ে এ নির্বাচনী তফসিলটি ঘোষনা করা হয় তখন বাস্তব সত্যিটা আরো কঠিন হয়ে বাজলো আমার বুকের মাঝে। আজ এতদিন পর প্রয়াত নেতা শওকত হোসেন হিরনকে নিয়ে লেখা কোন স্মৃতিকথা ততটা আবেগঘন হিসাবে পাঠকের কাছে গ্রহনযোগ্য হবে না। পাঠকের এ কথাটি চিন্তা করেও জেনে শুনে আমি বিষ করার মতই বিষাদের নীল ছায়ায় বসে আমি আধুনিক যন্ত্রদানব কম্পিউটারের বাটন টিপে যাচ্ছি।  কথায় আছে ‘ এই একুশ শতকে শোকের আয়ু বড় জোর ৪৮ ঘন্টা’। এ প্রবাদটি হিরন ভাই মিথ্যা করে দিয়ে এখনো আমাদের হৃদয়ে অবিরাম রক্ত ক্ষরন ঘটিয়ে চলছেন। ‘ ভূলিতে পারি না তারে , ভোলা যায় না/ বারে বারে মনে পড়ে , কেন জানি না।’
গতকাল তফসিল ঘোষনার পর পাহাড় সমান শোক নিয়ে আর চুপ থাকতে পারলাম না। এ মহান মানুষটির মহা প্রয়ানে শেষ শ্রদ্ধাঞ্জলী জানাতে গিয়ে মনে পড়ে হাজারো কথা।  মৃত্যুঞ্জয়ী এ মানুষটির সাথে হাজারো স্মৃতি হৃদয়ের ভিতর গুমড়ে কেদেই চলে অবিরাম। এমন মানুষটিকে শেষ শ্রদ্ধাঞ্জলী না জানানো আমার কাছে অপরাধের সামিল।
রাজনীতিবিদরা স্বাভাবিক কারনেই পত্রিকার কাছে নিউজ সংক্রান্ত বিষয়ে প্রায়ই নানান বায়না ধরে থাকেন। এ  ক্ষেত্রে নেতার সাথে যে সাংবাদিকের যেমন ঘনিষ্টতা তেমনি প্রধান্য পাওয়ার রেওয়াজ রয়েছে । আমাদের রাজনীতি আর মিডিয়া সংস্কৃতিতে এটা তেমন দোষের কিছু নয়। সংবাদকর্মীর সাথে যে নেতার সখ্যতা যতটা গভীর আবদারটা সে রকম মাপেরই হয়ে থাকে। হিরন ভাই রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি সম্পন্ন লোক ছিলেন ।  মিডিয়ায় তার নিজের ও দলের সুবিধা- অসুবিধার কথা তুলে ধরতে ঘনিষ্ট সাংবাদিকদের সহায়তা চাইবেন এটাই স্বাভাবিক। তবে ব্যক্তি হিরনের ব্যতিক্রম চরিত্র আমি পেশাগত ভাবে যে রকম দেখেছি তাতে তিনি হাস্যজ্বল কন্ঠে প্রায়ই আমাকে বলতেন ‘ কোন নিউজের ব্যাপারে আমারে ফোন করার দরকার নাই, আমার যে বক্তব্য ছাপা হলে ভাল হয় বলে তুই মনে কর তা বুঝে শুনে লিখে দিস, তাতেই চলবে, তোকে ব্লাংঙ্ক চেক (অংক না বসানো খালি চেকের পাতা) দিয়ে দিলাম’। এমনও দিন গেছে ফোন  করে তার বক্তব্য জানতে চাওয়া মাত্রই  তাৎক্ষনিক বলতেন ‘ আমি যা কইলে ভাল হয় বলে তুই মনে করো- সেটাই লিখে দে, আমি এখন রাখি ব্রাদার , নাউ আইএম বিজি’। বিশেষ গুরুত্বপূর্ন বিষয় গুলোও তিনি হেয়ালী মনে হেসে খেলে এ ভাবেই এড়িয়ে যেতেন। এমনকি মৃত্যু নিয়েও তাকে প্রায়ই হেয়ালী কথা বার্তা বলতে শুনেছি।  সেই হাসি খুশী মানুষটির মৃত্যুও যে হেয়ালীপনার মধ্য দিয়ে এমন নির্মম সত্য হয়ে আমাদের সামনে হাজির হবে তা কে জানতো ! নিষ্টুর নিয়তি তাকে আজ আমাদের কাছ থেকে অনেক দূরে নিয়ে গেছে। বহু দূরে আজ আমাদের হিরন ভাই। এক কথায় পৃথিবীর মানুষ্য জীব থেকে সকলের ধরা ছোয়ার বাইরে তিনি। সম্পূর্ন সুস্থ্য , সজীব, সতেজ- সক্ষম কর্মবীর, ফুল টাইম রাজনীতিতে সক্রিয় ব্যক্তির এই আকস্মিক প্রয়ান যেন অনেকটাই বিনা মেঘে বজ্রপাত। হিরন ভাই বেচে নেই এ কথাটি এখনো বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। তার এমন চলে যাওয়ায় অনেকের মত আমিও ‘কিং কর্তব্য বিমূঢ়’ হয়ে পড়েছিলাম। তাই তাকে নিয়ে কি ভাবে, কি লিখবো কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি। দিশেহারা হৃদয় আমার তাকে নিয়ে কিছু লেখার সায় দিল না। হিরন বিহীন এই নগরীতে অন্ধকার দূর করতে নিত্য দিনই পূর্বাকাশে সূর্য্য উঠে। আবার হাহাকার ছড়াতে সূর্য্য তার নিয়মেই অস্ত যায়। দিন যায়, রাত যায় আমি বসে ভাবি হায়- দিন-রাত মিলে একে একে ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে ঝড়ে গেছে প্রায় ২০টি দিন। তার আসনটি গতকাল শুন্য ঘোষনা করে তফসিল ঘোষনাও হয়ে গেল যথা নিয়মে। আজ থেকে মনোনয়ন সংগ্রহ, জমাদান, প্রত্যাহার আর সর্বশেষ নির্বাচনী দিনে হয়তো শাসকদলের ঘরে ঘরে শোভা পাবে বিজয়ের উল্লাস। সেই উল্লাসের মাঝেই চাপা পড়ে যাবে দৃষ্টির বাইরে চলে যাওয়া এক রাজনীতিবিদ শওকত হোসেন হিরনের কথা। এ সব কিছুই বুঝতে পারছি  তবু কেন জানি মন সায় দেয় না এ কথা যে- আমাদের হিরন ভাই আর বেচে নেই।

তিনি  আর কখনোই তার কোন সভা -সমাবেশের ছবি সহ নিউজ লেখার আবদার করবেন না। নগরীর কোন সমস্যা – সম্ভবনার কথা তুলে ধরার জন্য পরামর্শ দিবেন না।  কোন সংবাদ লেখার জন্য দাবী খাটিয়ে আদরের সুরে গালি দিবেন না । কোন আবদার অনুরোধ বা অনুনয় বিনয় ছাড়াই তার মৃত্যুর পর গণমাধ্যম তাকে নিয়ে একের পর এক মোটা হরফে বিশাল শিরোনাম করেছেন, তার দূর্লভ ছবি প্রকাশ করে সম্মান জানিয়েছেন। বিশেষ করে বরিশালের স্থানীয় পত্র-পত্রিকা ও সর্বপরি বরিশালবাসীর যে শ্রদ্ধা ও ভালবাসা মৃত্যুর পরে হিরন ভাই পেলেন তাতে বলতে হচ্ছে ‘ বাদশা তোমায় ছেলাম’। সারা জীবনটাই তুমি হাসি খুশিতে মেতে ছিলে।  সবাইকে কাদিয়ে নিজে হাসি মুখে চলে গেছো। এপার ও ওপার দুই পারেই তুমি জনতার ভালবাসায় সিক্ত হয়েছো। কথায় আছে ‘ এ ধরায় তুমি  যখন এসেছিলে, তখন তুমি কেদেছিলে,  হেসেছিল সবে’। আর যে দিন তুমি চলে গেলে হাসি মুখে তখন কাদলো সবাই।
তফসিল ঘোষনার আগে আরো একদিন হিরন ভাইয়ের জন্য হৃদয়ে হাহাকার অনূভব করেছি। দিনটি ছিল ১৯ এপ্রিল। হিরন ভাই’র প্রিয় আড্ডাস্থল হিসাবে পরিচিত ঐতিহ্যবাহী বরিশাল ক্লাবে ঐ দিন তার স্মরনে বিশেষ দোয়া মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বৃটিশ বেনিয়াদের তৈরী ইউরোপিয়ান ক্লাবটি কালের বিবর্তনে শুধু বরিশাল ক্লাবে রুপ নিয়ে থেমে নেই। বরিশাল ক্লাবকে আধুনিকতার ছোয়া দিয়েছেন হিরন। বরিশালবাসীর গর্ব করার মত একটি ক্লাবে বরিশাল ক্লাবকে রুপ দিতে তার অনেক কাঠ খড় পোড়াতে হয়েছে। ঘরের ভাত খেয়ে বনের মহিষ তাড়ানোর মত এ কাজে হিরন ভাই’র জীবন যৌবনের স্বর্নালী অধ্যায়ের একটি বিশাল সময় কেটে গেছে ক্লাবের অভ্যন্তরেই।

অত্যাধুনিক বরিশাল ক্লাবের প্রান পুরুষ হিসাবে পরিচিত হয়ে উঠা হিরনের জীবনের কত সোনালী সকাল, উপ্তত দুপুর, উদাস বিকাল আর মায়াবী সন্ধ্যা এই ক্লাবে কেটেছে তার হিসাব নেই। মাঝে মধ্যে বিনোদন পিপাষু নগরবাসীর জন্য স্বর্ণালী সন্ধ্যার আয়োজন করে গভীর রাত পর্যন্ত কাটিয়ে দিয়েছেন ক্লাবের মাঠে। সুস্থ্য জীবনের অন্তিম মুহুর্তটি পর্যন্ত তিনি এই ক্লাবের লনে হেটে বেড়িয়েছেন। ক্লাবের প্রতিটি ভবনের ইট , বালু , সিমেন্ট, সুরকী, পাথর থেকে শুরু করে সবুজ গাছ-গাছালি পর্যন্ত তার কন্ঠ শুনতে যেন আজও কান পেতে অপেক্ষারত। তাদের প্রতিক্ষা শুধু সেই প্রিয় মুখ, সেই প্রিয় নাম, সেই প্রিয় কন্ঠস্বর, সেই প্রিয় ব্যক্তিটির জন্য। অথচ তার জন্যই দু’হাত তুলে সকলে দোয়া করছেন পরম করুনাময়ের কাছে। আর কখনো তিনি ফিরে আসবেন না বরিশাল ক্লাবের অমৃত লাল দে মিলনায়তন কিংবা টেনিস গ্রাউন্ডের অস্থায়ী প্যান্ডেলের আনন্দ আসরে। এটা যখন ভাবছিলাম তখন আমীন – আমীন ধ্বনির পবিত্র আওয়াজে নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। স্মৃতির মিনারে গভীর শ্রদ্ধায় দু’ ফোটা চোখের জল ছাড়তে হলো। ক্লাবের প্রতিটি প্রান্তে তার হাটা চলা- বসে আড্ডা দেওয়া সবই চোখে ভাসছে। বরিশাল ক্লাব থেকে ফিরে  আসার পরও হৃদয়ের মনিকোঠায় বার বার ভেসে উঠছিল তার প্রিয় হাসি মাখা মুখটি। কখনো গালি, কখনো ধমক আর কখনো স্নেহ – ভালবাসা। ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারনে হাজারো আনন্দঘন মধূর স্মৃতি কখনোই ¤œান হবার মত নয়।
হিরন ভাইর সাথে কবে কখন কিভাবে পরিচয় এবং সেই থেকে ঘনিষ্টতা। মধূর সম্পর্ক থেকে মিষ্টি মধূর- মধূরিমা। এরপর বাড়তে থাকে দূরত্ব। সেই দূরত্ব থেকেই যেন সবকিছু দূরে ঠেলে দিয়ে পৃথিবী হতে হাজারো মান- অভিমানে  নিজেকে আড়াল করে নিয়েছেন হিরন ভাই। এটা ব্যক্তি শওকত হোসেন হিরনের সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা বললাম। এ রকম একজন দক্ষ উদার রাজনীতিবিদ বা অহিংস্র নি:হংকার অন্যান্য সাংগঠনিক যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তির সার্বিক চরিত্র বিশ্লেষন করা আমার মত ক্ষুদ্র সংবাদকর্মীর পক্ষে সম্ভব নয়। রাজনীতির রাজা হিসাবে গড়ে উঠতে শুরু করা হিরনের মেয়র হিসাবে নগর ভবন বা প্রতিষ্টান পরিচালনায় যোগ্যতা বা মেধা, মনন, প্রজ্ঞা, যোগ্যতা ও দক্ষতার  বিশ্লেষন করতে হলে বিশাল আকারে একটি বই প্রকাশ করা প্রয়োজন। জননেতা জনাব শওকত হোসেন হিরন মানুষ হিসাবে কেমন ছিলেন, মেয়র কিংবা উপজেলা চেয়ারম্যান হিসাবে তার ভূমিকার কথা মায়ের কাছে মাসী বাড়ির গল্পের মতই মনে হবে। তাই কাছের মানুষটির সাথে দূরত্ব সৃষ্ঠি হওয়ার পর তিনি যে দূরেই চলে গেলেন সেই মনবেদনা ভূলতে পারছি না।
আমার ব্যক্তিগত ভাগ্য রেখা অনুযায়ী কখনোই রাজনীতিবিদদের ক্ষমতার সময় তাদের ধারে কাছে থাকা হয় না। বরং দূরত্ব বেড়ে যায় অনেক। তবে খুব কাছ থেকে দেখা হিরন ভাই’র সাথে মেলামেশা বা মাখামাখিটা এমন পর্যায় ছিল যে সেটা রাজনীতি আর সাংবাদিক হিসাবে ভাগ করার মত নয়। বয়সের ব্যবধান ভূলে বন্ধুর মতই ছিল সম্পর্কটা। দুষ্টমীর ছলে গালি দিয়ে কথা বলতেন। আর সেই গালিও যেন অনেক মধুর ছিল। গানের কথার মতই ‘ বেদনা মধূর হয়ে যায় , তুমি যদি দাও, চোখের তারায় নামে স্বপ্ন তুমি যদি চাও’। তার সেই দু’ চোখের স্বপ্নের চাওয়া – পাওয়ার হিসাব টা আর শেষ পর্যন্ত মিলল না। সকলের দৃষ্টির অগোচরে তিনি চলে গেছেন। চলে যাওয়ার পর সকলের মতই আমারও আফসোস হায়রে প্রাচ্যের ভেনিস নগর উন্নয়নের এই অগ্রদূত কেন এ ভাবে অকালে চলে গেলেন। সত্যি কথা বলতে হলে আমাদের অগ্রজ সময়ের সাহসী সাংবাদিক শওকত মিলটন ভাইয়ের সাথে তাল মিলিয়ে বলতে হচ্ছে ‘আমাদের হিরন ভাই’ ছিলেন মেয়র হওয়ার আগে পর্যন্ত। তখন তিনি একটা নির্দিষ্ট গন্ডিতে আমাদের কয়েক জন কে ঘিরেই ছিলেন। মিলটন ভাই’র বাসা ছাড়াও প্লানের্ট ওয়ার্ল্ড শিশু পার্ক, প্রয়াত ব্যবসায়ী মিরাজ আহমেদ এর লিভার ব্্রার্দাসের (বর্তমান ইউনিলিভার) অফিসে রাত জেগে আড্ডায় মিলটন ভাই, পুলক দা ও প্রয়াত মিরাজ আহমেদ এর বাইরে তেমন কাউকে নিয়মিত দেখেছি বলে মনে হয় না। মিরাজ ভাই, হিরন ভাই আজ বেচে নেই। মিলটন ভাই রাজধানী ঢাকার বাসিন্দা। তবুও পুলক দা’র বাইরে এখনো এই নগরীতে হিরন ভাইয়ের আমৃত্যু বিশ্বস্থ কর্মী হিসাবে পরিচিত কালু বেচে আছে। গভীর রাতে আড্ডা শেষে কালুই মোটর বাইকে পৌছে দিতেন হিরন ভাইকে। গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডায় তিনি নিজের রাজনীতির ক্যরিয়ার ও বরিশালের উন্নয়নের ভাবনার কথা বলতেন। মাঝে মধ্যে তার ভাবনার কথা গুলো বাস্তবে অসম্ভব বলে মনে হতো। কিন্ত তিনি সিটি মেয়র হওয়ার পর প্রমান করে গেছেন না তাকে দায়িত্ব দিলে তিনি সত্যিই চিত্র শিল্পীর মত মনের মাধুরী মিশিয়ে রং তুলির আচরে ছবির মত সাজিয়ে তুলতে পারেন নগর ভবন থেকে ৫৮ বর্গ কিলোমিটার এই সিটি কর্পোরেশনের এলাকাটি। অপ্রিয় হলেও সত্য হিরন ভাইয়ের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের কোন অংশীদ্বার ছিলাম না আমি বা সে সময়ের পুরনো ঘনিষ্ট আমার মত কয়েক জন। ২০০৮ সালের ৪ আগষ্ট একটি শ্বাসরুদ্ধকর রাতের লড়াইয়ে সাংবাদিক হিসাবে নিরপেক্ষতা ছেড়ে আমরা যেন হিরন ভাইয়ের কর্মী বনে গেলাম। উত্তেজিত হিরনের বজ্রকন্ঠে উত্তাল হয়ে উঠেছিল নির্বাচন কর্মকর্তার অফিস। ওয়ারলেস সেটে ভেসে এলো দু; সংবাদ  ‘ হিরন সাহেব যদি বেশী বাড়াবাড়ি করে তাইলে তাকে আটক করে ক্যাম্পে নিয়ে আসো’। সেনা সমর্থিত একটি অনির্বাচিত সরকারের আমলে এমন নির্দেশনায় বুঝলাম ভোটে না জিতলে হিরন ভাইকে হ্যান্ডকাপ পড়িয়ে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হবে। তাকে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তুলে নেওয়ার সময় চোখ দু’টি বেধে নিয়ে গেলেও আমরা অসহায় দর্শকের মত দাড়িয়ে দেখা ছাড়া আর হয়তো কিছুই করতে পারবো না। এমন দু:চিন্তার মাঝেই ভোটের রায়ে বিজয়ের মুকুট পড়লেন আমাদের প্রিয় হিরন ভাই।
আমাদের দীর্ঘ দিনের লালিত স্বপ্ন পূরনের পালা শুরু হলো। মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর সেই স্বপ্ন আমাদের ব্যক্তি জীবনে অধারাই থেকে গেল। স্বপ্নের মানুষটিও স্বপ্ন ভঙ্গ করে না ফেরার দেশে চলে গেলেন। মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর হিরন ভাই শপথ নিতে যেদিন ঢাকায় গেলেন সেদিন ৩ ভাগ্যবান সাংবাদিকের মধ্যে আমিও একজন ছিলাম তার ঘনিষ্ট স্নেহ ভাজন হিসাবে। এর পর দিন বদলের হাওয়ায় প্রথম আলোর শ্লোগানের মত হিরন ভাই বদলে গেলেন নাকি আমার নিজের ভাগ্য রেখা বদলে গেল কিছুই টের বুঝলাম না। বরিশাল ক্লাবে যাদের জীবনে কখনো দেখিনি তাদেরকে হিরন ভাই’র রুমে নিয়মিত আসতে দেখলাম। এদের মধ্যে কেউ কেউ নগরীর গন্যমান্য বা অতি পরিচিত জন। বয়সের ব্যবধানের কারনে নিজেই বিব্রতবোধ করতাম। হয়তো তারা আরো বেশী বিব্রতবোধ করেছেন। তাই আমি বা আমার মত জুনিয়র কেউ হিরন ভাইয়ের পাশে চেয়ারে বসে এত স্নেহ ভালবাসা অর্জন করুক তা হয়তো তাদের সহ্য হয়নি। এমন চাটুকরদের ভিরে গরু চোর থেকে শুরু করে এই নগরীর টেন্ডারবাজ -সন্ত্রাসীদের আনাগোনাও দেখলাম ধীরে ধীরে বেড়েই চলছে। এ সব স্বার্থপর লোকদের একটি চরিত্র থাকে দলের মধ্যে বিভাজন ও দ্বন্দ্ব সংঘাত তৈরী করে নিজেদের কদর বাড়ানো। তারা সেই কান পড়াই দিতে লাগলেন। নিজেরা স্বার্থ উদ্ধার করলেন। কেউ কেউ গাড়ি বা বাড়ির পাশাপাশি নিজের জীবদ্দশায় সড়কের নামটি পর্যন্ত নিজের নামেই তৈরী করতে হিরন ভাইকে ব্যবহার করলেন। আমি আমার ব্যক্তিগত চরিত্র বা নীতি’র কারনেই  হিরন ভাইয়ের প্রিয় হয়ে কাছে থাকতে পারিনি। নিজেই দূরে সরে নিজেকে গুটিয়ে নিলাম। মান- অভিমানে আর মনোকষ্ঠে হিরন ভাই কে নিয়ে শুধু গুনগুনিয়ে গান করা ছাড়া উপায় ছিল না —
‘ সত্যি বলছি তোমাকে আর ভালবাসি না/
সত্যি বলছি তোমাকে নিয়ে আর স্বপ্ন দেখি না/
এখন আমার সঙ্গী আকাশ, রাতের ধ্রুবতারা।
হিরন ভাই যে আরো বেশী অভিমান করে রাতের ধ্রুবতারা হয়েই আমার হৃদয়ে সারাটি জীবন রক্তক্ষরন ঘটাবেন তা কখনো ভাবিনি। হয়তো কিছু ভূল ছিল আমারো। তাইতো শেষ শ্রদ্ধায় অবনত চিত্তে বলছি ক্ষমা কর মোরে। তুমি রবে নিরবে – আমাদের হৃদয়ে।

ফেইসবুকে আমরা

পুরনো সংখ্যা

সেপ্টেম্বর ২০১৮
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« আগষ্ট    
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০