September 24, 2018

দোষে-গুনে নিরবে কাজ করা এক শিক্ষাবিদ

--- ১৬ এপ্রিল, ২০১৫

লিটন বাশার ॥ ভাটি অঞ্চলের এই দক্ষিন জনপদের মানুষকে তাদের নায্য অধিকার পেতে হলেও আন্দোলন সংগ্রামের জন্য মাঠে নামতে হয়। অবহেলিত এ অঞ্চলের মানুষের অধিকার প্রতিষ্টায় দীর্ঘ বিলম্বের কথাও সবার জানে। তেমনি আন্দোলন সংগ্রামের ফসল হিসাবে একটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে বরিশাল বিশ্ব বিদ্যালয়। এ স্বপ্নে বিশ্ব বিদ্যালয়ের জন্য বরিশালবাসীকে আন্দোলন করতে হয়েছেন ৩৩ বছর। মাওয়ায় পদ্মা সেতু নির্মানের জন্য এ অঞ্চলের সংগ্রামী মানুষ দীর্ঘ দিন আন্দোলন করেছেন। এখনো সেই স্বপ্ন অধরাই থেকে গেছে। সাফল্য হিসাবে বরিশালের আকাশে ডানা মেলেছে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান। এ বিমান সার্ভিস চালুর দাবীতেও দীর্ঘ আন্দোলনের ইতিহাস রয়েছে বরিশালবাসীর। আন্দোলন সংগ্রামের মুখে আগে একবার বিমানের সার্ভিস চালু হলেও বিগত তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দেশে জরুরী অবস্থা বিরাজমান থাকার সুযোগে গুটিয়ে নেওয়া হয়েছিল বিমানের অফিস পর্যন্ত। এ যেন দখিনের জনপদের বাসিন্দাদের আবেগ ও অধিকারকে নিয়ে ছিনি মিনি খেলার মতই খেলেছেন বিভিন্ন সময়ের শাসকরা। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবী পূরন নিয়েও কম খেলা হয়নি। বিভিন্ন সময়ে একেক রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা-নেত্রীরা মানুষের এ আবেগকে নিয়ে শুধুই প্রতিশ্রুতির প্রলোভনে ভোটের মাঠে আওয়াজ ছেড়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য টানা ৩৩ বছর আন্দোলন সংগ্রাম করে এ অঞ্চলের মানুষ যেন মানুষ নির্মেলন্দু গুনের ‘কেউ কথা রাখেনি’ বিখ্যাত কবিতাকে মিথ্যা প্রমান করে দিয়েছেন। এ অঞ্চলের মানুষের বিশ্ব বিদ্যালয়ের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য শেষ পর্যন্ত অঙ্গিকার রক্ষায় এগিয়ে আসেন মাননীয় প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শেখ হাসিনা তার বিচক্ষনতার পরিচয় দিয়েছেন প্রকল্প বাস্তবায়নে এ অঞ্চলের একজন শিক্ষাবিদকে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দিয়ে। বাউফলে জন্ম নেওয়া মৃত্তিকা বিজ্ঞানী ড. হারুনর রশিদ নাড়ীর টানেই যেন দক্ষিনাঞ্চলের মানুষের স্বপ্নকে নিজের স্বপ্ন পূরনের মত করে দ্রুত বাস্তবায়ন করেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যোগ্য লোক বাছাই করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্টার জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নিলেও এ বিশ্ব বিদ্যালয়ের জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়ার সময় স্বজন প্রীতির উপরে উঠতে পারেননি ভিসি ড. হারুনর রশিদ। প্রধানমন্ত্রী ভিসি নিয়োগের জন্য গোপালগঞ্জ থেকে লোক বাছাই না করলেও আমাদের ভিসি মহোদয় তার উপজেলা বাউফল সমিতির বাইরে খুব একটা যেতে পারেননি। বাউফলের বাইরে হাতে গোনা যে কয়জন এই ভিসি’র হাতের নিয়োগ পেয়েছেন তারাও হয়তো তার নিকট আতœীয় অথবা শাসক দল আওয়ামী লীগের শীর্ষ তদ্বিরবাজদের মাধ্যমে চাকুরী পেয়েছেন। অর্থাৎ বিশ্ব বিদ্যালয়ের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে সিনেট সদস্যরাও বিতর্কের উর্ধ্বে উঠতে পারেননি। এই বিতর্কিত নিয়োগ প্রক্রিয়ার অন্যান্য ভূমিকা পালন করেছেন আমাদের ভিসি মহোদয়।
যদিও বলতে হবে এ বিতর্কের বোঝা মাথা নিয়েই বরিশাল বিশ্ব বিদ্যালয় নামের মানুষ গড়ার এক প্রতিষ্টান গড়ায় ড. হারুনর রশিদ খানের ভূমিকা এ অঞ্চলের মানুষকে সারা জীবনই কৃতজ্ঞ করে রাখবে। মাটির টানেই নিরবে নিভৃতে তিনি কাজ করে দ্রুত বিশ্ব বিদ্যালয় প্রতিষ্টার মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের মানুষের কাছে তার ভূমিকা তুলে ধরেছেন। আমরা এ শিক্ষা প্রতিষ্টান গড়ে তোলায় তার আন্তরিকতা প্রতিটি পরদে পরদে লক্ষ্য করেছি। দ্রুত বিশ্ব বিদ্যালয়ের কাজ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তিনি কখনোই অগোছালো অপরিকল্পিত কোন পদক্ষেপ গ্রহন করেননি। তার নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের মতই দখিনের জানালা দিয়ে এ অঞ্চলের মানুষের স্বপ্নকে বাস্তবে রুপ দেননি। তিনি ভবিষ্যত পরিকল্পনার মাঝে রেখে গেছেন আমাদের। আমাদের নতুন দিনের স্বপ্ন দেখাতে গিয়ে কীর্তনখোলা নদীর তীরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ব বিদ্যালয় ও মেরিন একাডেমী গড়ে তোলার যে প্রক্রিয়া চলছে তা বাস্তবায়ন হলে পুরো এলাকাটি যে শুধু শিক্ষা নগরী গড়ে উঠবে তা নয়। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর মধ্যে আন্ত যোগাযোগ শিক্ষা কার্যক্রম গড়ে তোলা হলে শুধু বাংলাদেশ নয় পুরো পৃথিবীর নাম করা জ্ঞানের তীর্থ স্থান গুলোর মধ্য নাম করে নিবে এ বিশ্ব বিদ্যালয়। দখিনের মানুষকে এমন স্বপ্ন দেখানো সম্ভব হয়েছে এ অঞ্চলের কীর্তিমান পুরুষকে এমন প্রতিষ্টান গড়ে তোলার গুরু দায়িত্ব দেওয়ার কারনেই। কারন ঝুলিয়ে রাখার দেশ হিসাবে পরিচিত বাংলাদেশের মত জায়গায় মাত্র ৫ বছর দায়িত্ব পালন করেই ড. হারুনর রশিদ প্রমান করেছেন নানান বৈরী পরিবেশকে উপেক্ষা করেও কাজ করা সম্ভব যদি সে কাজের প্রতি আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকে।
জাপানের বিশ্ব বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শেষে দেশে ফিরে আসা গুনী শিক্ষক ড. হারুনর রশীদ খান এ বিশ্ব বিদ্যালয়ের প্রকল্প পরিচালক হিসাবে নিয়োগ পান ২০১০ সালের ১৮ ফ্রেবুয়ারী । এর পরই বরিশালবাসীর স্বপ্নের বিশ্ব বিদ্যালয় বাস্তবায়নের সকল প্রক্রিয়া দ্রুত গতিতে এগিয়ে যেতে থাকে। করিৎকর্মা প্রকল্প পরিচালক ড. ডারুনর রশিদ পরের বছর ১৮ এপ্রিল বিশ্ব বিদ্যালয়ের ভিসি হিসাবে নিয়োগ পান। বরিশালবাসীর শিক্ষা ক্ষেত্রে নতুন পথচলার দিগন্ত উম্মোচিত হয়। পাবনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্টার তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে সরকার দেশের আর কোথাও নিজস্ব ক্যাম্পাস ছাড়া অস্থায়ী ক্যাম্পাসে বিশ্ব বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু না করার সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন। কিন্ত ভিসি ড. হারুনর রশিদ খান বরিশাল বিশ্ব বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম জিলা স্কুলের অস্থায়ী ক্যাম্পাসে শুরু করার মধ্য দিয়ে প্রমান করেছেন সরকারের নীতি নির্ধারনি মহলে তার গ্রহনযোগত্যার কথা। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভিসি হিসেবে প্রফেসর ড. মোঃ হারুনর রশীদ খান ৫ বছর ২ মাস দায়িত্ব পালনের শেষ দিনটি হচ্ছে আজ শুক্রবার। গতকাল বৃহস্পতিবারই ছিল স্বপ্ন বাস্তবায়নের এ কারিগড়ের নিজ হাতে গড়ে তোলা প্রতিষ্টানের সর্বশেষ কর্ম দিবস। তাই আনুষ্টানিকতার মধ্য দিয়ে গতকাল তিনি বিদায় নিয়েছেন ঠিকই কিন্ত এ অঞ্চলের মানুষের মন থেকে তিনি কখনোই বিদায় নিতে পারবেন না। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি অধিগ্রহণ অবকাঠামো নির্মাণ ও শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে তিনি নিরবে দৌড়ঝাপ করেছেন। জমি অধিগ্রহন করতে গিয়ে স্থানীয় ভূমি দস্যুদের মোকাবেলা করেছেন শান্ত মাথায়। মামলাবাজদের বাধায় তিনি পিছু হটা তো দূরের কথা কখনো থমকে দাড়াননি। নিজের সাহসিকতা ও বুদ্ধিমত্তা দিয়েই কীর্তনখোলার তীরবর্তী এক মনোরম পরিবেশে প্রতিষ্টা করে গেছেন উচ্চ বিদ্যাপিঠ । মাত্র ৪ বছরেই ভিসি’র দায়িত্ব পালন কালে তিনি এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬টি অনুষদের ১৮টি বিভাগে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে এ বিশ্ব বিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩ হাজার ৬৯৯ জন । শিক্ষক রয়েছেন প্রায় একশ। কীর্তনখোলা নদীর তীরবর্তী ক্যাম্পাসে ৪টি ভবনের নির্মাণ কাজ সমাপ্তির পথে। নির্মাণাধীন রয়েছে আরো ১২টি ভবন। এছাড়াও ছাত্রদের জন্য ২টি হোস্টেল, ছাত্রীদের জন্য একটি, শিক্ষকদের থাকার জন্য একটি ভবন, কর্মকর্তাদের থাকার জন্য ১টি ভবনের নির্মাণ কাজ প্রায় সমাপ্তির পথে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২টি জিপগাড়ী, ২টি মাইক্রোবাস সহ ৫টি নিজস্ব বাস রয়েছে এরমধ্যে ৪টি বাস শিক্ষার্থীদের পরিবহন করে। এছাড়াও বিআরটিসি’র ২টি ভাড়া বাস রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জণ্য আরো ৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প আগামী একনেকের সভায় পাশ হবে এমন সম্ভবনার দ্বারপ্রান্তেই বিদায় নিতে হলো সকল কাজের সফল সমাপ্তির গৌরব অর্জনকারী ভিসি ড. হারুনর রশিদকে। নিজের প্রতিষ্টানের ন্যায় অনেক যতেœ গড়ে তোলা এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য তিনি বিদায়কালে চালু করে গেছেন ভিসি ট্রাস্ট। যতটা জেনেছি বিশ্ব বিদ্যালয়ের পাশেই ভিসি তার নিজের ব্যক্তিগত টাকায় এক খন্ড জমি ক্রয় করে তাতে চারতলা একটি ভবন নির্মান করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পাশে বসবাসের জন্যই ভিসি ঐ ভবন তৈরী করছেন বলে ধারনা ছিলো সকলেরই। কিন্ত যাওয়ার আগে তিনি চমক দিয়ে গেলেন বরিশালবাসীকে। ঐ ভবনের ভাড়ার টাকা সবই ব্যায় হবে শিক্ষার্থীদের বৃত্তি হিসাবে। গতকাল তিনি বিদায় গ্রহন কালে ঘোষনা দেন ট্রাস্ট ভবনের ভাড়া থেকে প্রাপ্ত অর্থ ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রতি বছর ১৮টি বিভাগে ১ম, ২য় বর্ষের উল্লেখিত ক্যাটাগরিতে মোট ৭২ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি পাবে। এছাড়াও প্রতি বছর ১ জন করে গবেষণায় শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, শ্রেষ্ঠ কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে পুরস্কৃত করা হবে এ টাকায়। অর্থাৎ ধুপ যেমন গন্ধ বিলিয়ে নিজেকে উজার করে দেয় তেমনি জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়া মানুষটি সবকিছুই উজাড় করে দিলেন বিশ্ব বিদ্যালয়ের জন্য। গুনী এ শিক্ষক হয়তো দক্ষ প্রশাসক বা সাংগঠনিক যোগ্যতা সম্পন্ন ছিলেন না তাই শহীদ মিনার থেকে বিশ্ব বিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস পর্যন্ত একাধিক বার অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছিল। সর্বোপরি বলতে হয় দোষে গুনেই মানুষ। সব মানুষের মাঝে সব গুন বা সব যোগ্যতা থাকতে হবে এমন কোন কথা নেই। তবে একটি পাবলিক বিশ্ব বিদ্যালয়ের প্রতিষ্টার জন্য এ অঞ্চলের সন্তান হিসাবে ড. হারুনর রশিদ যে অনন্য ভূমিকা পালন করে গেছেন তা মানুষ কখনোই মন থেকে মুছতে পারবে না। আর বিশ্ব বিদ্যালয়ের প্রতিষ্টাতা ভিসি হিসাবে তার নামটি অনন্তকাল জ্বলবে যতদিন এ প্রতিষ্টান জ্ঞানের আলো ছড়াবে ততদিন। জ্ঞানের সন্ধানে কিংবা দেশের সেবায় যিনি এ প্রদ্বীপের কাছে ছুটবেন তিনিই জানবেন এ বাতিঘরের আলো জ্বালাতে সবার আগে যিনি ছুটে এসেছিলেন তিনি ড. হারনর রশিদ খান।

ফেইসবুকে আমরা

পুরনো সংখ্যা

সেপ্টেম্বর ২০১৮
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« আগষ্ট    
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০