November 19, 2018

পদ্মা বিসর্জনে দখিনের মানুষ কি পেল!

--- ২২ এপ্রিল, ২০১৩

লিটন বাশার ॥ পদ্মা সেতু প্রকল্পে দূর্ণীতির অনিয়ম ও ঘুষের কথা স্বীকার করায় কানাডার বৃহত্তম নির্মাণ প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান এসএনসি-লাভালিনকে ১০ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করেছে বিশ্বব্যাংক। একই সংগে লাভালিনের গ্রেফতারকৃত দুই কর্মকর্তাকে আদালতে বিচারের মুখোমুখী করতে অভিযোগ আমলে নিয়েছেন সে দেশের আদালত।  দেশ বিদেশের হরেক রকমের গনমাধ্যমে বাহারীর শিরোনামে এ খবরটি প্রকাশিত হয়েছে এবং বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে আরো সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। প্রকাশিত খবরে সরকারের ঘুষ দূর্ণীতি- স্বজনপ্রীতি এবং বিদেশের মাটিতে দেশের ভাবমূর্তি বিনস্ট সহ নানান ইঙ্গিত করা হয়েছে। শুরুতেই বাংলাদেশ সরকার ও অভিযোগ যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন সহ সংশ্লিষ্টরা নিজেদের ধোয়া তুলসি পাতা হিসাবে দাবী করে আসছেন। কানাডার আদালতে যখন লাভালিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গ্রহন করেছেন ঠিক তখনই প্রধান অভিযুক্ত সৈয়দ আবুল হোসেন নিজের টাকা খরচ করে তার বক্তব্য প্রকাশিত করেছেন একটি দৈনিক পত্রিকায়। প্রকাশিত বক্তব্যে মনে হয়েছে হযরত মুহম্মদ (সা:) এর পর দুনিয়ায় যদি কোন সৎ নিষ্টাবান লোক দুনিয়ায় জন্ম নিয়ে থাকেন তা হচ্ছে আমাদের আবুল। তিনি নিজের লেখায় নিজেকে ধোয়া তুলসী পাতা শব্দটি ব্যবহার করতেও ছাড়েননি। কথায় আছে ‘ নিজে যারে বড় বলে, বড় সে সে তো নয়, লোকে যারে বড় বলে , বড় সে তো হয়”। অবশ্য আবুলের বেলায় এটা এমন প্রবাদ হতে পারে ‘লোকে যারে ভাল বলে ভাল সে তে নয়, নিজে যাকে ভাল বলে ভাল সে তো হয়’। প্রবাদ যাই হোক। আর আবুল ভাল মন্দ খারাপ দোষী, নির্দোষী যাই হউন না কেন তাতে দখিনের মানুষের কোন লাভ লোকসান নেই। এটি তার একান্ত কেরিয়ারের বিষয়। দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েক কোটি মানুষের প্রানের দাবী এ পদ্মা নদীর উপর মাওয়া পয়েন্টে সেতু নির্মান। এ সেতু নিয়ে দক্ষিন – পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষ বিগত জোট সরকারের আমলে ব্যাপক আন্দোলন সংগ্রাম করেছেন। তখনই চুড়ান্ত হয়েছিল মাওয়ায় সেতুন নির্মানের সিদ্ধান্ত। তত্বাবধায়ক সরকার পেরিয়ে নির্বাচনী প্রচারনায় সেতু নিয়ে আওয়ামী লীগ সবার আগে প্রধান প্রতিশ্র“তি দিয়েছিলেন। তারা সরকার গঠন করে ক্ষমতার পালা বদলের সময় এসে গেছেন। কিন্ত দখিনের মানুষকে হতাশা আর বঞ্চনা ছাড়া এ সেতু নিয়ে সরকার আর কিছুই দিতে পারেননি।  সরকার বা সরকারের মন্ত্রী আমলারা দূর্নীতিতে জড়িয়েছে নাকি দেশ প্রেমিক খেতাব প্রাপ্ত হয়েছেন তা নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই দক্ষিন – পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের মাঝে।  তাদের চোখে মুখে শুধুই হতাশার ছাপ। যে বুক ভরা আশা নিয়ে উন্নয়ন ও যোগাযোগ বৈষম্যের শিকার এ অঞ্চলের শেখ হাসিনাকে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়েছিল সেই প্রত্যাশার সিকি ভাগও কি বর্তমান সরকার পূরন করতে পেরেছেন? এমনকি পূরনের যে কোন লক্ষন নেই সেটাও আজ স্পষ্ট এ অঞ্চলের মানুষের কাছে। বোধ করি এ সরকার যে পদ্মা সেতু নির্মান করতে পারবেন না তা হয়তো দেশবাসীও বুঝে গেছেন।  শুরুতেই বিশ্ব ব্যাংক চুক্তির সময় বার বার মাওয়া ঘাটে বসে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতার তাগাদা দিয়ে ছিল। সেই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্টানে প্রধান তিন অভিযুক্ত তৎকালীন যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মশিউর রহমান ও যোগাযোগ মন্ত্রনালয়ের  সচিব মোশারফ হোসেন ভূইয়া উপস্থিত ছিলেন। কথায় আছে না, ‘চোরে শোনে না ধর্মের কাহিনী’। তেমনকি আবুল ও তার সহযোগীরা শুনলো না বিশ্ব ব্যাংকের ব্যাবস্থাপনা পরিচালকের কথা। সেতুর কাজ সিকি ভাগ এগুলো না। দখিনের মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে শুরু করা মন্ত্রী উপদেষ্টা ও সচিবরা এ প্রকল্প ঘিরে তাদের ভাগ্যের চাকা কি ভাবে ঘুরানো যায় তা নিয়ে এসএনসি লাভালিনের সাথে দেন দরবারে ব্যস্ত ছিল ।  কাকের মত লুকিয়ে চুরি করা সেতু প্রকল্পের অভিযুক্তরা বুঝতে পারেনি তাদের এ চতুর গিরি মানুষ দেখছে। তারা আমলে নেয়নি বিশ্ব ব্যাংকের বক্তব্য। গোপনে সাবেক পর রাষ্ট্রপ্রতি মন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীর সাথে এসএনসি লাভালিনকে কাজ দিলে কে কত ভাগ টাকা পাবেন তা নিয়ে দরকষাকষি করতে থাকেন। বিষয়টি বিশ্ব ব্যাংক সহ দেশী বিদেশী গনমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় তুললেও আবুলের পরশ মনির মুখ থেকে হাসি সরে নি। তিনি হাসি খুশী বেমালুম ভাল মানুষ সাজার প্রান্তকর অপচেষ্টার পাশাপাশি দূর্নীতির কথা অস্বীকার করে আওয়ামী লীগ আমলেই পদ্মা সেতু তৈরী করার আশ্বাস দিয়ে দখিনের মানুষের সাথে আরো একটি প্রতারনার আশ্রয় নিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী যখন আবুলকে দেশ প্রেমিক আখ্যা দেন তখনও আবুল হাসেন। আবার যখন বিশ্ব ব্যাংক চুক্তি বাতিল করার পর আবুলকে মন্ত্রী পরিষদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় তখনও আবুল হাসেন। পদ্মার ঘোলা জলে ভেসে গেল পদ্মা সেতু প্রকল্পের স্বপ্ন। এক আবুলের কারনে কোটি মানুষের স্বপ্নের পদ্মা বিসর্জন দিতে হল দেশবাসীকে।  কিন্ত আবুলের মুখের হাশি গেল না কিছুতেই। আবুল অধ্যায়য়ের যবনিকাপাত ঘটার পরও অর্থমন্ত্রী থেকে শুরু করে দায়িত্বশীল মন্ত্রীরা সেতু তৈরীর কাজ এ সরকারের আমলেই শুরু করার মিথ্যা প্রতিশ্র“তি দিয়ে আরেকটি প্রতারনার ফাদ পেতেছেন দখিনের অবহেলিত মানুষের সামনে। অবশ্য মানুষ বুঝে গেছে এ সব মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয়। সেতুতে কে কতভাগ ঘুষ পাচ্ছেন তার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে কানাডায় গ্রেফতার কৃত রমেশ সাহার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী। কানাডার পুলিশ রমেশ সাহা ও তার সহকর্মীর জব্দ ল্যাপটপে ছক করে রাখা কে কত পাসের্ন্ট ঘুষ পাচেছন তাও উদ্ধার করেছে। ডায়রী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে কোম্পানীর খরচ তালিকায় কাজ পেতে কাকে কত টাকা উৎকোচ দেওয়া হচ্ছে তা।  রমেশ ও তার সহকর্মীকে কানাডার আদালতে বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে। আর আমাদের আবুল মামা পেয়েছেন দেশ প্রেমিকের খেতাব। কথায় আছে চোরের মার নাকি বড় গলা হয়। আবুলের বিজ্ঞাপনী ভাষার লেখা পড়ে তাই মনে হলো। আবুলের দোষ-নির্দোষ আর লেখা লেখি নিয়ে কোন ভাবনা নেই দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের। তাদের  এ নিয়ে কোন কিছু যায় আসে না। যদি পার্সেন্ট পেয়ে দেশ প্রেমিকের পরিবর্তে অন্য কোন খেতাব পেয়েও আবুল বা বর্তমান সরকার পদ্মা  নদীর উপর মাওয়ায় আমাদের স্বপ্নের সেতুটি তৈরী করে দিতেন তাইলেও হতো আমাদের বড় পাওয়া হতো। কুয়াকাটার পর্যটন কেন্দ্র বিকাশ করার পাশাপাশি ভোলার প্রাপ্ত গ্যাস কাজে লাগিয়ে এ অঞ্চলের অর্থনীতির চাকা হয়তো ঘুরতো। বহু কষ্টে থাকা দখিনের মানুষের ভাগ্যের চাকা হয়তো কিছু হলেও ঘুরতো। তারা দু- বেলা দু- মুঠো খেয়ে নিজের এলাকায় বাস করতে পারতো। কিন্ত সেতুর পরিবর্তে মুখে চুনকালি লেপন হলো পুরো দেশ বাসীর।
১০ পাসেন্ট ঘুষ
পদ্মাসেতু প্রকল্পে পরামর্শক খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের মধ্যে ১০ আবার কোন কোন গনমাধ্যমে ১২  শতাংশ অর্থ ঘুষ বাবদ বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের মধ্যে বন্টনের বিষয়ে পরিষ্কার নোট রয়েছে রমেশ সাহার ডায়েরীতে। সেখানে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমানকে ১/২ শতাংশ, সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে ৪ শতাংশ, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী কায়সারকে ২ শতাংশ, আওয়ামী লীগ নেতা ও সংসদের হুইপ নূরে আলম চৌধুরীর ভাই মজিবুর রহমান নিক্সন চৌধুরী ২ শতাংশ এবং সাবেক সেতু সচিব মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়াকে ১/২ শতাংশ অর্থ প্রদানের কথা উল্লেখ রয়েছে। রমেশ সাহার এই ডায়েরির ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংক ২৫ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে বলেও সংবাদ মাধ্যমের খবরে বলা হয়।প্রকাশিত খবর শুধু দক্ষিনাঞ্চলের মানুষকে হতাশ করেনি ক্ষুদ্ধ করে তুলেছে। ঘুষ কেলেংকারীর সাথে জড়িতদের বিচারের চেয়ে দখিনের মানুষের বড় দাবী পদ্মা সেতু। এ সরকারের আমলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হবে না তা দুদকের বক্তব্যে এবং কর্মকান্ডে স্পষ্ঠ প্রমানিত হয়েছে। আর এ অঞ্চলের মানুষ কোন সরকারের আমলেই ঘুষ-দূর্নীতির সাথে জড়িতদের বিচার দেখতে চায় না। তারা চায় সেতু। তাই যারাই ক্ষমতায় থাকুক তাদের দায়িত্ব মানুষের আবেগ ও ভালবাসার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এ সেতুটি বাস্তবায়ন করা।

ফেইসবুকে আমরা

পুরনো সংখ্যা

নভেম্বর ২০১৮
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« অক্টোবর    
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০