September 25, 2018

পুলিশের গোয়েন্দা রিপোর্টে আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা !

--- ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

 লিটন বাশার ॥ একটি প্রবাদ আছে ‘ যার নাই কোন গতি, সে করে উকলাতি’। বাবা- মায়ের অকর্মা  সন্তান হিসাবে আমরাও একদা এ পেশায় নাম লেখানোর মনোবাসনা জাগ্রত হয়েছিল। কিন্ত তাও যোগ্যতায় প্রমান করতে পারিনি। আমার অযোগ্যতা এলএলবি প্রথম পর্বের পর আর ফাইনাল পরীক্ষায় অংশ গ্রহন করা হয়নি। অমল কান্তি যেমন রোদ্দুর শেষ পর্যন্ত রোদ্দুর হতে পারেনি আমিও তেমনি উকিল হতে পারলাম না।  সাংবাদিকতার নেশায় আমার উকিল হওয়ার স্বপ্নটি ধুলোয় লুটোপুটি খেয়েছে। তবে উকলাতি পড়তে গিয়ে আমার অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে। সেই ল’ কলেজের প্রয়াত অধ্যক্ষ শ্রদ্ধেয় এ্যাডভোকেট এনায়েত পীর খান স্যারের ছাত্র হওয়া, উকলাতির বিভিন্ন বইয়ের নাম ও আইন মুখস্থ করাসহ নানান বিষয় অভিজ্ঞতা সঞ্চার করেছি। আইনের ছাত্রদের প্রথম বর্ষে যাহা পড়ানো হয় তা বর্তমানে আদালতের পেশায় কতটা কাজে লাগে তা আমি অবশ্য এখনো বুঝি না। তবে পরীক্ষা দিতে গিয়া চরম অভিজ্ঞতা সঞ্চার করলাম। বাবার বয়সী লোকরা সন্তানদের  পাশে বসে পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তর লিখে যাচ্ছেন। তবে আমি যখন আইন পরীক্ষা দিয়েছি ততদিন পর্যন্ত এই পরীক্ষায় অসদুপায়  অবলম্বন করা তেমন দোষের কিছু ছিল না জেনে শুনেই পরীক্ষার হলে গেলাম।
বর্তমানে অগ্রনী ব্যাংকের পরিচালক এ্যাডভোকেট বলরাম পোদ্দার, বিএম কলেজের সাবেক জিএস মার্কিন প্রবাসী এডভোকেট নৃপেন্দ্র কুমার দাস নিপু , সমকালের ব্যুারো প্রধান বরিশাল প্রেসক্লাবের বর্তমান সাধারন সম্পাদক পুলক চ্যার্টাজী সহ আমরা কয়েকজন ঘনিষ্টরা মিলে মিশে একত্রে ফরম ফিলাপ করায় আসন বিন্যাসের সময় আমাদের সকলের আসনই পাশাপাশি নির্ধারিত হয়েছিল। আবার কাকতালীয় ভাবে আমার ঠিক পিছনে সিট পড়েছিল বর্তমান যুবলীগ নেতা এ্যাডভোকেট সুভাষিশ দত্ত বাপ্পীর। ঘনিষ্টতার সুবাদে এখনো প্রায়ই রাস্তাঘাটে বাপ্পী উকিল হওয়া এবং আমি বা পুলক দা’ উকিল হতে না পারার বিষয়টি নিয়ে বিদ্রুপ করি। পরীক্ষার হলে কি কান্ড বাপ্পী করেছিল দুষ্টামীর ছলে তা নিয়ে স্মৃতি চারনও করি মাঝে মধ্যে। আমাদের সাথে একই কক্ষে বসে স্ব-স্ত্রীক পরীক্ষা দিয়েছিলেন বিএনপি নেতা আনোয়ারুল হক তারিনসহ আওয়ামী লীগ – বিএনপি’র অনেকেই। বিএম কলেজের সাবেক ভিপি জসিম উদ্দিনসহ কয়েক জনের আসন পাশের কক্ষে পরেছিল তা এখনো চোখে ভাসে।
বিএনপি আমলে নকল করে পরীক্ষা দিয়ে পাশ করার জন্য নাম ছড়িয়ে পরছিল সিটি কলেজের। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা আসার পর প্রথম যে এইচএসসি বা ডিগ্রী পরীক্ষা ঐ কলেজে অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেই পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের নকল করে পাশ করার মনোবাসনা আর পুরন হয়নি।  তৎকালিন জেলা প্রশাসনের ম্যাজিষ্ট্রেট রবিউল ইসলাম সিটি কলেজকে নকল মুক্ত করে নকলবাজদের কাছে এক আতংকের নামে পরিনত হয়েছিলেন। তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বরিশাল কলেজে অনুষ্ঠিত এলএলবি প্রথম পর্বের পরীক্ষা কেন্দ্রে। তিনি সিটি কলেজের তরিকায় পরীক্ষা শুরুর সাথে সাথেই এক প্রভাবশালী ছাত্রলীগ নেতার উত্তরপত্র জব্দ করেন। এ নিয়ে তুমুল হট্টগোল শুরু হয় পরীক্ষার হলে। এক পর্যায়ে পরীক্ষা বন্ধ। পরীক্ষার্থী আর বহিরাগতদের তোপের মুখে ম্যাজিষ্ট্রেট রবিউল সাহেব অধ্যক্ষ’র কক্ষে আশ্রয় গ্রহন করেন। পরে তৎকালিন এনডিসি’র দায়িত্বে থাকা ম্যাজিষ্ট্রেট কামাল উদ্দিন খান পরীক্ষা কেন্দ্রে গিয়ে ছাত্রনেতাদের সাথে বৈঠক করে পুনরায় পরীক্ষা শুরুর ব্যবস্থা করে দেন।  সেইদিন একটা অভিজ্ঞতা হয়েছিল। পরীক্ষার হলে দেখেছি নকলের দাবীতে ছাত্রলীগ নেতার পক্ষে সোচ্চার ভূমিকায়  ছাত্রদল ও বিএনপি’র নেতারা। অথচ বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যার দৃশ্যটা  ভিন্নরুপ পেল। সন্ধ্যায় সেই আন্দোলনকারী বিএনপি- ছাত্রদলের নেতারাই পরীক্ষার হলে ছাত্রলীগের হাতে ম্যাজিষ্ট্রেট লাঞ্চিত হওয়ায় তীব্র নিন্দা ক্ষোভ আরো যা – যা রাজনীতির ভাষায় লেখা থাকে তা জুড়ে একটি লম্বা বিবৃতি দিলেন।
সেদিন অবাক হয়েছিলাম রাজনীতির ভাষা দেখে আর এবার অবাক হলাম গোয়েন্দা পুলিশের একটি গোপন প্রতিবেদন দেখে। তাও আবার আমার নিজের সম্পর্কে। সরকারী দপ্তরের প্রয়োজনে অতিরিক্ত মহা পুলিশ পরিদর্শক (রাজনৈতিক) এর কার্যালয় থেকে একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদন চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছিল বরিশাল মেট্টোপলিটন পুলিশের কাছে। বিএমপি’র এসবি হতে আমাদের সম্পর্কে খোজ খবর নেওয়া শুরু হলো। অপ্রিয় সত্য হলো আমাদের দেশে গোপন প্রতিবেদন আর গোপন থাকে না তা ওপেন হয়ে যায়। আর কারো ব্যক্তিগত প্রয়োজনের প্রতিবেদন হলে তো সে জানবেই। বর্তমানে সিটি এসবি’র দায়িত্বে থাকা ইন্সপেক্টর রফিকুল ইসলাম আমার প্রিয় পুলিশ অফিসারদের একজন। সেই কোতয়ালী থানার দারোগা থেকে শুরু করে একই থানার ওসি এরপর নবগঠিত কাউনিয়া থানার ওসি সহ দীর্ঘদিন তিনি বরিশালে থাকায় এখানকার মাটি ও মানুষের  সাথে তার একটি  পৃথক সম্পর্ক তৈরী হয়েছে। তাই হয়তো আমার মত অনেকেই তাকে পরউপকারী ভাল দক্ষ পুলিশ অফিসার হিসাবে জানেন। সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসার আমার প্রিয় হওয়ার কারনে আগে ভাগেই তাকে বিষয়টি আমি অবহিত করেছিলাম। মুশকিল হলো তিনিও তদন্ত কাজটি তার প্রিয় বা বিশ্বস্থ অধিনস্থ সহকর্মী এসআই মুরাদকে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দিলেন। এই এসআই মুরাদকে চেহারায় না চিনলেও এক সময়ে কাউনিয়া থানার বহু অপকর্মের হোতা হিসাবে নামটি মুখস্থ। থানার বর্তমান আলোচিত সমালোচিত বিতর্কিত ওসি পাজী মাহবুব এর ঘনিষ্ট এই সহযোগী এই মুরাদকে শাস্তিমূলক এসবিতে বদলী করা হয়েছে। তাই আমার সম্পর্কে অনুসন্ধানের দায়িত্ব পেয়ে ফোন করার সাথে সাথেই চিনে ফেললাম। এর পর ২/১ বার কথা হয়েছে। অনুসন্ধানের স্বার্থে তিনি প্রয়োজনীয় – অপ্রয়োজনীয় বহু কাগজ পত্র চাইলেন। যথা সম্ভব সরবারহ করা করলাম। একটি বারের জন্য ভূলেও এই দারোগা সাহেব আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করলেন না বা শিক্ষাগত যোগ্যতার কোন সনদ চাওয়ার প্রয়োজন মনে করলেন না। ঢাকায় প্রতিবেদনটি পাঠানোর পর ফোনে জানলাম এটা আছে, ওটা নাই। এই নাই, ঐ নাই আরো কত যে নাই তারও কোন শেষ নাই। যাই হোক পুনরায় বিএমপিতে তদন্ত প্রতিবেদন না চেয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রতিবেদনটি তৈরীর অনুরোধ করলাম। অত্যাধুনিক তথ্য প্রযু্িক্তর যুগে আর বেশী সময় লাগলো না। ঢাকার এসবি থেকে প্রতিবেদনের অনুলিপি তুলে দেখলাম প্রায় সবই ঠিক আছে। ছোট্ট একটি নেতিবাচক তথ্যের পাশাপাশি আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচ,এসসি লিখে দেওয়া হয়েছে। একাধিক লোকের শিক্ষাগত যোগ্যতার মধ্যে আমার শিক্ষাগত যোগ্যতাটা এইচএসসি কেমনে হলো কিছুই বুঝতে পারলাম না। আমরা যারা মোটামুটি অর্ধ শিক্ষিত লোক বলেও দাবী করি- তারা সকলেই জানি উকলাতি পড়তে হলে কমপক্ষে ডিগ্রী (বিএ) পাশ করতে হয়। আমি এইচএসসি পাশ করে কি ভাবে ল’ কলেজে ভর্তি হলাম এবং আইন পরীক্ষায় অংশ নিলাম তাও আজ আমার কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুললো বিএমপি’র অনুসন্ধানের দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্তা ব্যক্তিটি। যদিও বিএমপি’র একজন উপ-পুলিশ কমিশনারের বরাত দিয়েই ঢাকাস্থ গোয়েন্দা পুলিশের দপ্তর থেকে এ প্রতিবেদনটি পাওয়া গেছে। তবুও জানি উপ-পুলিশ কমিশনাররা এসব কাগজে না দেখেই স্বাক্ষর করেন। তাদের অধিনস্থরা এ প্রতিবেদন তৈরী করে স্বাক্ষর নিয়ে থাকেন। আমার সম্পর্কে তৈরী করা প্রতিবেদনটি যিনি তৈরী করেছেন সেই দারোগা সাহেবকে সামনা-সামনি না চিনলেও বরিশাল মেট্টোপলিটন পুলিশের সম্মানিত কমিশনার জনাব মো: শামসুদ্দিন সহ উপ-পুলিশ কমিশনারগন এবং অনেক ইন্সপেক্টরদের সাথে চেনা জানা আছে। তারাও আমাকে খুব ভাল ভাবেই চেনেন। আমি চিনি। কারো সাথে সম্পর্ক এখন মধূর আবার কারো সাথে অতীতে মধুর ছিল। দেখা সাক্ষাৎ সহ দীর্ঘ  কথা বার্তাও হয়েছে অনেকের সাথে সেই আমার সম্পর্কেই প্রতিবেদন তৈরী করতে গিয়ে পুলিশ এমন অনুসন্ধানের প্রমান দিলেন। তাইলে যারা দারোগা বাড়ির নাম শুনলেও সেই বাড়ির সামনে দিয়ে হাটেন না তারা কেমন প্রতিবেদন পান , কেমন দূর্ভোগ তাদের পদে পদে পোহাতে হয় সেই ভাবনা থেকেই এই লেখাটি লিখলাম। কারন আমার এমএ পাশের যদি সনদ থাকে তাইলে দারোগার এ প্রতিবেদনে কিছুই যায় আসে না। শুধু সরকারী দপ্তরের কেরানীদের হাত ঘুরার সময় আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে তাদের একটু নেতিবাচক ধারনা আমাকে হেয় করতে পারে। আর হাতে ক্ষমতা পেয়ে দারোগা সাহেব আমাকে এ ভাবেই হয়তো একটু হেয় করার অপচেষ্টা করছেন মাত্র।

ফেইসবুকে আমরা

পুরনো সংখ্যা

সেপ্টেম্বর ২০১৮
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« আগষ্ট    
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০