September 25, 2018

ফেলানীর বিচার এবং ড্রোন মোতায়েন

--- ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

লিটন বাশার ॥ একটি বহুল প্রবাদ আছে গ্রামের সুন্দরী বিধবা নাকি সকলের ভাবি। তাকে নিয়ে আপত্তিকর রং তামাশা করলে কোন দোষ নেই। গ্রামের মাতুব্বর- মোড়ল সকলেই যখন এই রং তামাশায় মগ্ন তখন আর  সুন্দরীর সম্ভ্রম রক্ষার কথা বলবে কে? শহুরে ভাষায় যাকে এখন ইভটিজিং বলে তা গ্রাম গঞ্জের ভাবী কিংবা অবলা নারীদের বেলায় যুগ যুগ ধরে গতানুগতিক ভাবেই চলে আসছে। আর গ্রাম্য নারীদের এটা সহে যেতে হয়। তারা নিরুপায়। গ্রামের অসহায় দরিদ্র সুন্দরী নারীর মতই আমাদের সুন্দর সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলে ভরা বাংলাদেশ এখন বহুরুপী খপ্পরে পরেছে। বাঙালীর উপর শোষন নির্যাতন নতুন কিছু নয়। বৃটিশ বেনিয়াদের শাসন, পাকিস্তানের শোষন, কাবুলিওয়ালা, ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী হয়ে এনজিও আর দাতা গোষ্টি সেজে শোষন নীপিড়ন অব্যাহত রাখা হয়েছে আমাদের উপর। ৪১ বছর পূর্বে দেশ স্বাধীন হলেও স্বাধীনতার সুফল আমরা আজও ঘরে তুলতে পারিনি। বার বার বুর্জয়া সামাজ্যবাদের নানান ফর্মূলায় স্বাধীন বাংলাদেশের এখন ত্রাহী মধু সুদন অবস্থা। রাজনীতি থেকে অর্থনীতি , উন্নয়ন – মানবাধিকার সব কিছুই নিয়ন্ত্রন করেন বিদেশী প্রভূরা। উন্নয়ন সহযোগীর তকমা ঝুলিয়ে দাতা নামের ধনী দেশ গুলোর দাদাগিরি মাথা পেতে অবনত চিত্তে  আমাদের মেনে নিতে হচ্ছে। কিন্ত পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে। যে সব ধর্নাঢ্য রাস্ট্র সারা বিশ্বে মানবাধিকারের কথা বলে চিৎকার করেন, চোখ রাঙান সর্বদা , তাদের মুখে শব্দ বের হয় না ইরাক বা আফগানিস্তানে হামলার সময়। মিয়ানমারের হত্যাযজ্ঞ বিশ্ব বিবেক কে নাড়া দিতে পারেনি। সিরিয়ায় ঠিক ইরাকী স্টাইলের যখন মার্কিন সামাজ্যবাদের একক সিদ্ধান্তে রণ প্রস্তুতি চলছে তখন বাংলাদেশের সীমান্তে আমাদের পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের দাদা বাবুরা ড্রোন হামলার জন্য রণ প্রস্তুতি নিয়েছেন।  

স্বাধীন বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের জন্য উদ্বেগজনক এ খবরটি আজকের পরিবর্তন সহ দেশের শীর্ষ গণমাধ্যমে গত মঙ্গলবার গুরুত্ব সহকারে প্রকাশিত হয়েছে। দেশবাসীর সাথে আমারাও হতবাক হয়েছি ভারতীয় দাদাদের এমন হঠকারী সিদ্ধান্তে। ড্রোন হামলার নাম শুনেছি আমরা। এটি তালেবান জঙ্গীদের দমনে বিশ্ব মোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যাবহার করতে আমরা দেখেছি। মার্কিনীরা তালেবান দমনের নামে মুসলমানদের হত্যা করতে আফগানীস্তান ও সেখানকার পাশ্ববর্তী দেশ পাকিস্তানে অহরহ এ হামলা করছে। সেখানে তালেবানদের চেয়ে নিরহ বেসামরিক লোকই বেশী মারা যাচ্ছে বলে নিত্য দিনই গনমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হচ্ছে। তার প্রতিকার তো দূরের কথা ভারত নতুন করে বাংলাদেশ সীমান্তে ড্রোন মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কেন ভারত সরকারের এই হটকারী সিদ্ধান্ত? ভারত এবং বাংলাদেশ সীমান্ত পরিস্থিতি কি পাকিস্তান- ভারত সীমান্তের মতই যুদ্ধাবস্থা বিরাজমান? এই সীমান্তে কি কাশ্বমীর সমস্যা রয়েছে? এখানে কি কারগিল যুদ্ধের মত ভয়াবহ কোন যুদ্ধের আশংকা আছে? আমার মনে হয় দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থা থেকে শুরু করে আমজনতার কাছে প্রশ্ন করা হলেও তারা তা হাস্যকর বা অবান্তর প্রশ্ন বলে উড়িয়ে দিতে বাধ্য হবেন।  কারন ভারত ও বাংলাদেশ সীমান্তের মধ্যে কারগিল-কাশ্মীর নয়, আছে হৃদয়ের বন্ধন। এপার বাংলা আর ওপার বাংলার সীমান্তে রাইফেল হাতে দাড়িয়ে থাকা বিএসএফ আর বিজিবি টহলের বেড়াজালে আটকা পারে না আমাদের হৃদয়ের সেতু বন্ধন। আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানী হায়নাদের ভয়ে এই সীমান্ত পারি দিয়ে ওপার বাংলায় আশ্রয় নিয়েছি। লাখো মানুষের সেদিন ঢল নেমেছিল যশোর রোডে। নিরন্ন বিপন্ন মানুষের পাশে দাড়িয়েছিলেন পশ্চিম বাংলার মানুষ। কে হিন্দু, কে মুসলমান তার জাত বিভেদ ছিল না। এপার বাংলা – ওপার বাংলার মানুষের মাঝে যে আতœার সম্পর্ক সেদিন তৈরী হয়েছিল তা আজও অটুট। শুধু ক্ষমতার মসনদে বসা আর মসনদ টিকিয়ে রাখতে যারা মুকুল ফৌজের ভূমিকায় অবর্তীন তাদের ইচ্ছা – অনিচ্ছার দোলায় দুলছে আমাদের ভাগ্য।
আমরা প্রায়ই দেখি ভারত সীমান্তে নিত্য দিন মারা পরছে বাংলাদেশের হতভাগ্য গরু ব্যবসায়ী কিংবা নিরহ কোন আদম সন্তান। বিএসএফ এর গুলিবর্ষন আর নানান নির্যাতনে সীমান্তে যে বাঙালীর রক্ত গঙ্গা বইছে তার ইতিহাসে বিশ্ববাসীর হৃদয়ে নাম লেখিয়ে গেছে ফেলানী। যে নির্মম নির্যাতনের মধ্য দিয়ে ফেলানীকে হত্যা করে বিসিএফ এর পোষাক পরিহিত এক দানব লাশ ঝুলিয়ে রেখে উল্লাস করেছিল তা বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। সারাবিশ্বে যখন ফেলানীর এ নির্মম হত্যাকান্ড নিয়ে নিন্দার ঝড়  উঠেছিল তখন বিচারে বসতে বাধ্য হলো ভারতীয় সরকার। কিন্ত সে বিচার শেষ পর্যন্ত প্রহসনের বিচারে পরিনত হওয়ায় ফেলানীর হত্যাকারী হিসাবে অভিযুক্ত একমাত্র আসামী বিএসএফ জোয়ানটি বেকসুর খালাস পেল। প্রহসন মূলক এ বিচারের রায় ঘোষনার মাত্র ৪ দিন পরই সীমান্তে ড্রোন মোতায়েন করার ঘোষনা দিল ভারত। তবে তা জঙ্গী নির্মূলের জন্য নয়। এবার নাকি ড্রোন হামলা করা হবে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের উপর। তার মানি হচ্ছে এবার আর ফেলানীদের মৃত্যুর পর লাশ নিয়ে কোন উল্লাস নয়, চিরতরে হত্যার আলামত ধ্বংস করতেই এ মরনাস্ত্র যে ভারত মোতায়েন করেছে তা স্পষ্ট।

আজ এই হিংস্রতার কবলে যখন মানবতা গুমড়ে কাদে তখন সুনীল গঙ্গোপাধ্যয়কে খুব মিস করছি। যিনি পুশব্যাক, পুশ ইন নামের তামাশা পেতেছিল ভারত। সম্ভবত ২০০২ সালের দিকে। তখন সুনীল লিখেছিলেন আমি রাজনীতি ফিতি বুঝি না, আমি বুঝি মানুষ। ভূপেনের গানের কথা মনে পড়ে ‘ মানুষ মানুষের জন্য, একটু সহানূভূতি কি মানুষ পেতে পারে না’। অথবা গঙ্গা আমার মা, পদ্মা আমার মা, ও আমার দুই চোখে দুই জলের ধারা মেঘনা-যমুনা, গঙ্গা আমার মা….একই আকাশ , একই বাতাস, এক হৃদয়ে একই আকাশ, দোয়েল কোয়েল পাখির ঠোটে একই মুর্চ্ছনা, আমার দুই চোখে দুই জলের ধারা মেঘনা-যমুনা/ এপার ওপার কোন পারে জানিনা , ও..আমি সবখানেতেই আছি, একই আশা ভালবাসা, কান্না হাসির একই ভাষা, দু:খ সুখের বুকের মাঝে একই যন্ত্রনা ’ এ সব মানবতার কথা যারা হৃদয় দিয়ে অনুভব করতেন তারা নেই আজ কোথাও তাদের   কন্ঠে ভেষে উঠা আমাদের হৃদয়ের কথা আজ যেন স্তদ্ধ করে দিতেই সীমান্তে এ  মরনাস্ত্র প্রস্তত করা হয়েছে। এ যেন অপরাধ না করেও রবী ঠাকুরের ‘দু’বিঘা জমি’ কবির শেষ ছন্দ ‘ তুমি মহারাজ সাধু হল আজ, আমি আজি চোর বটে।’

আমাদের দু’ বাংলার মানুষের হৃদয়ে শিক্ষা সংস্কৃতির যে ভালবাসার বন্ধন তার মাঝে কেন আজ ফেলানীর নির্মমতা আবার কেন এই ড্রোন নামের ধ্বংস যজ্ঞ নিয়ে এগিয়ে আসা। এটি বাংলাদেশের প্রগতিশীল মানুষ থেকে সকল মানুষের জিজ্ঞাসা ভারতের দাদা বাবুদের কাছে।

ফেইসবুকে আমরা

পুরনো সংখ্যা

সেপ্টেম্বর ২০১৮
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« আগষ্ট    
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০