November 13, 2018

বন্যার ভয়াবহ রুপ

--- ২ আগস্ট, ২০১৬

লিটন বাশার ॥ বন্যার ভয়াবহ রুপ, প্রকৃতি দারুন বিরুপ। যাহাদের সম্বল চোখেরও পানি ; তাহাদের সাথে আমি হবো যে সাথী।
যাহাদের আশ্রয় নিয়ে গেছে বন্যায়; তাহাদের সাথে আমি হবো যে সাথী।
পুরোটা মনে না থাকলেও প্রায়ই এ রকমই একটি গান এমন দিনে শুনতে হতো বিটিভি’র রাত ৮টার খবরের আগে কিংবা পরে। সংগীতের সুরের মুর্চ্ছনায় যে দৃশ্যপট চোখে ভাসতো তাতে দেখা যেতো তৎকালীন স্বৈরশাসক এরশাদ তার মন্ত্রীদের নিয়ে বণ্যা দূর্গত এলাকায় ঘুরছেন। কোমর সমান পানিতে নেমে হেটে হেটে বানভাসী মানুষের খোজ নিচ্ছেন এরশাদ। গন আন্দোলনের মুখে তার পতনের পরও এমন দূর্লভ ছবি গুলো এরশাদের মন্ত্রী সভার সদস্যদের বাসা বাড়িতে দেখা গেছে। ছবি’র ক্যাপশন পাল্টে লেখা হয়েছে ‘ দেশ সেবার এ কি উপহার!’ । যাদের বাসায় এ ছবি গুলো দেখেছি তারা সকলেই তখন হরেক মামলার আসামী। হুলিয়া মাথায় নিয়ে ঘুরছেন। তাই দেশবাসীর সহানুভূতি পেতে ছবি’র এমন ক্যাপশন রদ-বদল করা হয়েছে। স্বৈরশাসকের পতনের পর আমরা গনতন্ত্রের পথে হেটেছি কিছু দিন। কিন্ত সেই বন্যা আর সেই গণতন্ত্রের জন্য হাহাকার কি থেমেছে? নাকি বানভাসী মানুষের চোখের লোনা জল আর ভোটাধিকারের জন্য লড়াই সংগ্রামটা সেই ২৬ বছরের পুরানো দিনের কথাই আমাদের স্মরন করিয়ে দেয়! এমন কোন অশুভ শক্তি বাঙালী জাতি সত্বা কে নিয়ে খেলারামের মত অবিরাম খেলে যাচ্ছে! যে একুশ শতকের সভ্যতাকে আজ টেনে হেচড়ে মধ্য যুগে নিয়ে যেতে চাইছে!
আজ থেকে দু’ দশক আগে অগ্রজ সাংবাদিক মুরাদ আহমেদ তার রম্য রচনায় লিখেছিলেন ‘ বন্যা হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থকরী ফসলের মত’ অর্থাৎ বন্যা হয় বলেই বিদেশী সাহায্য আসে। আর সেই সাহায্যের টাকায় আমাদের দেশের বাজেট তৈরী হয়।
দিন বদলের হাওয়ায় এখন অবশ্য সেই সমীকরন নেই। আমাদের অর্থনীতির মন্থর আর শ্লোথ গতির ধারা পাল্টে গেছে। বিদেশী সাহায্য নির্ভর বাজেট এখন আর আমাদের অর্থ মন্ত্রীকে পেশ করতে হয় না। বরং জলবায়ূ পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্থ বাংলাদেশকে নায্য হিস্যা দিচ্ছে না দায়ী রাস্ট্র গুলো। তারা দূরে বসে প্রায়ই আমাদের বিবেকের কড়া নাড়ে, নানান কথা শোনায়। ধনী দেশ গুলো ধরিত্রীকে ধ্বংস করছে কিন্ত মাশুল দিচ্ছে বাংলাদেশের মত হতদরিদ্র রাস্ট্র গুলো। পৃথিবীর পরিবেশ বিপন্ন করে এরা মরনাস্ত্র তৈরী করছে আবার নানান উপদেশ দিয়ে যাচ্ছেন। এ যেন দূর্বলের উপর সবলের অত্যাচারের একটি উদাহরন বটে। যে ভাবে প্রতিবেশী ধনী দেশ ভারতের ফারাক্কা বাধের নেতিবাচক প্রভাবে আজ বিপন্ন বাংলাদেশ। ভাটির দেশ হিসাবে পানির যে নায্য হিস্যা তা কখনোই বাংলাদেশকে দেয়নি ভারত। আন্তজার্তিক নিয়ম কানুন উপেক্ষা করেই তারা মরুর দেশে রুপ দিয়েছে বাংলাদেশকে। ফারাক্কা বাধের প্রভাবে ভরাট হয়ে গেছে এদেশের সিংহভাগ নদী এবং বিশাল নদী গুলো যখন নাব্যতা হারিয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছে সেই সময়ে প্রতি বছর বর্ষাকাল এলেই সেই ফারাক্কা বাধ ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে যা হবার তাই হচ্ছে। নাব্যতা হারানো নদী গুলো যখন বর্ষার পানিতে টই-টুম্বর হয়ে থাকে তখনই ভারত থেকে গঙ্গা -যমুনার পানির ঢল নেমে আসে রুপসী বাংলায়। সেই পানিতেই প্লাবিত হয় পদ্মা মেঘনার দু’তীর। বন্যা শুরু হয় উত্তর বঙ্গে। কিন্ত সেই পানি বঙ্গোপসাগরে গড়ানো পর্যন্ত যুক্ত হয় সারা দেশের নদীর তীরবর্তী লাখ লাখ মানুষের চোখের লোনা জল। উত্তর বঙ্গের পানির ¯্রােত মধ্য অঞ্চল হয়ে ধীরে ধীরে প্রবাহিত হয় দখিন জনপদে। মেঘনার পর কীর্তনখোলা, আড়িয়াল খা, কালাবদর, তেতুলিয়া, বিষখালী, সুগন্ধা, সন্ধ্যা, আগুনমুখা, লাউকাঠী, বুড়া গৌরগঙ্গা ও কারখানা নদীর পানি বাড়তে থাকে। নদীর দু’তীর প্লাবিত হয়ে বন্যা কবলিত হয় দখিনের লাখো মানুষ। ঝড় ঝঞ্জার সাথে লড়াই করে বেচে থাকা দখিনের মানুষের এ বাণের পানিতেই দু:খ শেষ হয় না। বন্যার পানিতে নদীর ভাঙ্গন সামান্য থাকলেও যখন পানি সাগরে নেমে যেতে শুরু করে তখন সেই ¯্রােতের টানে ভয়াবহ আকার ধারন করে নদী ভাঙ্গন। ঘর, বাড়ি, বাগান, স্কুল-কলেজ, হাট-বাজার, লোকালয় কিছুই রেহাই পায় না এ ভাঙ্গনের হাত থেকে।
নদী ভাঙ্গনে প্রতি বছর দখিন জনপদের হাজার হাজার মানুষ তাদের ঘর বাড়ি হারিয়ে আশ্রয় নেয় বেরীবাধের উপরে। ২/১ বছরের মধ্যেই আবার সেখানে নদী ভাঙ্গন আঘাত করে। নদীর কড়াল গ্রাসে হারিয়ে যায় বাধের সাথে লোকালয় আরো বেশ কিছু জনপদ। ঘরবাড়ি সহায় সম্বল হারিয়ে মানুষ রুটি রুজির সন্ধানে ছোটেন রাজধানী ঢাকা কিংবা বিভাগীয় বড় কোন শহরে। আশ্রয় জোটে বস্তিতে। রিক্সা কিংবা ভ্যান অথবা ঠেলাগাড়ী ঠেলে তাদের জীবন চলে। নারীরা কেউ ঝিয়ের কাজে যুক্ত হয়ে সংসারের ভরন পোষনের জোগান দিয়ে থাকেন। যাদের এক সময় ছিল গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু আর পুকুর ভরা মাছ তারাই এখন দু’বেলা দু’ মুঠো খেয়ে বাচার জন্য জীবন যুদ্ধে সামিল হয়েছে শহুরের নগর জীবনের জঞ্জালে।
নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধে প্রতি বছরই সরকারী ভাবে কোটি কোটি টাকা বরাদ্ধ করা হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে এ টাকায় কি আদৌ নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধ হচ্ছে! নাকি পুরো টাকায়ই যাচ্ছে ঠিকাদার আর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পকেটে। নদী ভাঙ্গনের শিকার হওয়া সাধারন মানুষ মনে করেন- স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত যত টাকা নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধে খরচ হয়েছে সে টাকায় নদী ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবার গুলোকে পুর্ণবাসন করা সম্ভব হতো। বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। কারন স্বাধীনতার পর গত ৪৫ বছরে পদ্মা -মেঘনায় বহু পানি গড়িয়েছে। এই ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের মতই বানভাসী ও নদী ভাঙ্গুলী মানুষের চোখের পানিকে পূজি করে কতিপয় রাজনৈতিক দুর্বত্ত টাকার পাহাড় গড়েছেন। কিন্ত উপকূলের নদী ভাঙ্গুলী সেই মানুষ গুলোর চোখের পানি আজো শুকায়নি। এখনো নিত্য দিনই তাদের প্রকৃতির সাথে লড়াই করে বেচে থাকতে হচ্ছে। জীবন যুদ্ধে পরাজিত এ মানুষ গুলোকে ঘুরে দাড়ানোর সুযোগ দিতে হবে ।

ফেইসবুকে আমরা

পুরনো সংখ্যা

নভেম্বর ২০১৮
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« অক্টোবর    
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০