September 25, 2018

বরিশালের চেয়ে বিলেত সহজ!—

--- ২৭ জানুয়ারি, ২০১৫

লিটন বাশার ॥
এবার শীতের পাতাঝরা গানের রিক্ততা প্রকৃতিতে ধরা পড়লো অনেক বিলম্বে। নবান্নের দেশ হিসাবে পরিচিত এই বাংলায় কুয়াশার ডানায় ভর করে উকি মারা সূর্য নানান স্মৃতি আমাদের হৃদয়ে আলোড়িত করে । কাচা চুলোর পাশে রোদপিঠে খেজুরের রসে হরেক খাবারের সাথে শীতের মৌসুমের তাজা মাছের ঝোল দিয়ে কড়কড়ে গরম ভাত মাখার কথা আমার মত কৃষক পুত্রের হয়তো এখন ভাবতেই ভালো লাগে। ভাবনার নগর দোলায় বানিজ্যিক ও রাজনৈতিক সংকটের মাঝে সেই ছেলে বেলার কথা যদি কখনো উকি দেয় তখন মনে হয় শীতেরও দেবার মত অনেক ঐশ্বর্য রয়েছে। প্রকৃতি থেকে কিংবা বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা থেকে আমরা অবশ্য খুবই গ্রহন করি। নিজেরা যা বলি তা হয়তো বিশ্বাস করি না, আবার বিশ্বাস করলেও নিজের জীবনে বাস্তবায়ন নেই। এমন প্রশ্ন মনে জাগ্রত হওয়ার কারন গতকাল বিশ্বের সবচেয়ে বৃহত্তর গনতন্ত্রের দেশ ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস পালিত হয়েছে। এই প্রথম এ দিবসে প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। গত কয়েক দিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি’র রাজ প্রাসাদে ওবামার সাথে কানে মুখে কথা আর চা, কফি খাওয়ার সচিত্র খবরে সয়লাব ছিল আমাদের মিডিয়া । ভারত আমাদের প্রতিবেশী দেশ হিসাবে ! বারাক ওবামার আগমনের জন্য নাকি পৃথিবীর বৃহত্তম গনতন্ত্রের দেশ হিসাবে আমাদের মিডিয়া জুড়ে এত তোলপাড় তা এই ক্ষুদ্র সাংবাদিকতার দৌড়ে বুঝে উঠতে পারেনি।
সেই ক্ষুদ্র জ্ঞানের পরিধি নিয়েই গতকাল সকালে টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখলাম। ভেসে উঠলো সেই আলোচিত ৬৬ তম প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্টান। রিমোর্ট যেতেতু হাতে সেহেতু ‘ আট / দশ টা চ্যানেল ডিশে বিনোদনের অভাব কিসে!’ আর দশ জনের মত আমিও ইচ্ছা মাফিক চ্যানেল ঘুরাতে রিমোর্ট টিপে যাচ্ছি। কিন্ত ঘুরে ফিরে সেই একই দৃশ্য। বৃষ্টিভেজা মাঠে ভারতের ফৌজি বাহিনীর কুচকাওয়াজ। প্রধান অতিথি বারাক ওবামাকে সভা মঞ্চে রেখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ছুটে গেলেন ভিন দলের রাস্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীকে বরন করতে। প্রনব গাড়ি থেকে নামার সাথে সাথেই তাকে অভ্যর্থনা জানালেন। এরপর মোদী প্রেসিডেন্টকে সাথে নিয়ে মূল মঞ্চে পৌছান। সেখানে অভিবাধন গ্রহনের পাশাপাপশি দু’জন নিহত সৈনিককে দেশের সর্বোচ্চ পদকে ভূষিত করা হয়। প্রথম জন কাশ্মিরে গত বছর প্রান দিয়েছে। তার স্ত্রীকে পদক ও মরোন্নত্তর সংম্বর্ধনা দেওয়া হলো।
আনন্দঘন আড়ম্বরপূর্ন এ অনুষ্টান থেকে শেখার অনেক কিছুই রয়েছে আমাদের। কিন্ত কথা হচ্ছে পশ্চিম বাংলার টেলিভিশন চ্যানেল ছাড়াও বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি টিভি চ্যানেল এ অনুষ্টান সম্প্রচার করছে। যারা সব সময়ে পশ্চিম বঙ্গের টেলিভিশনের আগ্রাসন বন্ধ এবং ঢাকার টিভি চ্যানেল গুলো একই ভাবে ভারতে প্রদর্শনের সুযোগ চেয়ে সোচ্চার দাবী জানিয়ে আসছেন। সেই দাবীর অগ্রভাগে থেকে তারাই কেন এটা সম্প্রচার করার মত উদারতা দেখাতে গেলেন বুঝে উঠতে পারেনি।
জানি এত ক্ষুদ্র স্থান থেকে এত বড় প্রশ্ন বেমানান। এ ধরনের প্রশ্ন নিজের বিবেকের মাঝেই ঘুরপাক খেতে থাকে। এত সহজ প্রশ্নের উত্তর খুব সহজে মেলে না। তাই সহজ সরল হিসাব মিলাতে গিয়ে দেখলাম লেখার শুরুতে যে অংশের স্মৃতি চারন করছিলাম সেই ছায়াঘেরা বণবনানীতে ঠাসা এলাকাটি এই মহানগরী থেকে উকি দিলেই দেখা চায়। প্রদ্বীপের নীচে অন্ধকারের মত যুগ যুগের একটি অবহেলিত এলাকা। কীর্তনখোলা নদী যেমন চরকাউয়ার নদী ভাঙ্গুলী মানুষের কপালে দু:খ এনে দিয়ে ভূ- স্বামী করেছে রসুলপুর, মোহম্মদপুর ও পলাশপুরের কথিত মালিকদের তেমনি যেমন গাঙ্গের ঘোলা জলের মতই ঘোলাটে থেকে গেছে চরমোনাই এলাকার মানুষের ভাগ্য।
সহজ ভাবনায় জানতে চাইলে দেখা যাবে দেখা যাবে যেই দিল্লী নগরীতে ঘটা করে এ প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্টান অনুষ্ঠিত হলো সেখানে বরিশাল থেকে সড়ক পথে যাতায়াত করতে কোন নদী বা ফেরী পারাপারের ঝক্কি- ঝামেলা নেই। কিন্ত এই নগরী থেকে এখনো আপনাকে চরমোনাই যেতে হলে প্রমত্তা কীর্তনখোলা নদী পারি দেওয়ার জন্য জানতে হবে বেলতলা ফেরীর সময় সূচী। সাথে ফেরীর ইঞ্জিন সহ চালক – ড্রাইভার ঠিক আছে তো! সে সব খবর নিশ্চিত না হয়ে গেলে আপনার বিপদ আরো কয়েক গুন বৃদ্ধি পাবে।
চরমোনাইকে সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে আজ থেকে দু’ বছর পূর্বে এলজিইডি বিশ্বাসের হাট নদীর উপর একটি সেতু নির্মানের কাজ শুরু করেছে। এ সেতুর কাজ কবে শেষ হবে কে জানে।
আমরা জানি – প্রদ্বীপের নীচে অন্ধকারের মতই যে দ্বীপভূমি হিসাবে পড়ে আছে চরমোনাই সেখানে যেতে ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হলেও খুব সহজেই যাতায়াত করা যায় পাশ্ববর্তী দেশ কলকাতা, দিল্লী , বুম্বে এমনকি বিলেত পর্যন্ত। নতুন প্রজন্মের কাছে বিলেত শব্দটি হারাতে বসেছে। অথচ তারা যে ব্রিটেন বা ইউ,কে হিসাবে লন্ডন নগরীর গল্প গুজবে মেতে থাকেন, সেই লন্ডন শহর নাকি গড়ে উঠেছে আমাদের বাংলাদেশী কৃষক শ্রেণীর শ্রমের পয়সায়। বৃটিশ বেনিয়ারা ভারত উপ-মহাদেশে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী হিসাবে আমাদের উপর যে সব জুলুম নীপিড়ন চালিয়ে মহা-রাজার বেসে জীবন যাপন করেছে তার রসদ জোগাতে হয়েছে ভৌগলিক সীমানায় অবস্থান করে নেওয়া এই বাংলার খেটে খাওয়া মানুষকে।
অথচ এখানকার আন্তযোগাযোগ ব্যবস্থা আর উন্নত বিশ্বের স্বার্থে আমাদের সাথে তাদের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার পার্থক্য এত ফারাক কেন। আশা করি এমন প্রশ্নের উত্তর আর নতুন করে খুজতে হবে না। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরও আমরা ক্ষমতার বিভেদ দ্বন্দ্ব সংঘাতে লিপ্ত থেকে রাজপথ কে রঞ্জিত করেই চলছি। আমাদের আন্তকলহ নিয়ে আজো আমরা হাজির হচ্ছি ভারতের বিজেপি প্রধানের আনুগত্য পেতে। আমাদের মিডিয়া ২২ ঘন্টা ধরে বিজেপি প্রধানের বক্তব্য সত্য মিথ্যার যাচাইয়ে নিরন্তর টেলিফোন করেই চলেন। ২২ ঘন্টার প্রচেষ্টার ফসল হিসাবে ২২ সেকেন্ডের টেলিফোন সংলাপ আবার পরবর্তী ৪৪ ঘন্টা ধরে আমরা এক্সুলসিভ রিপোর্ট হিসাবে শুনতে শুনতে কানের আয়ৃু কমে আসে। যাদের জীবনের ৬৬ ঘন্টা কাটে বিজেপি প্রধানের কথপকথোনে তাদের ভাগ্যের চাকা আদৌ কেউ কি ঘুরাতে পারবে ! নাকি ব্রিটিশ বেনিয়াদের পরিবর্তে এখন আমরাই আমাদের ধবংশ করতে যথেষ্ট হয়ে উঠেছি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাল মিলিয়ে ভারতের পথচলা যখন শুরু তখনও আমরা হাটছি পিছনের দিকেই।

ফেইসবুকে আমরা

পুরনো সংখ্যা

সেপ্টেম্বর ২০১৮
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« আগষ্ট    
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০