September 23, 2018

বাংলার ক্ষনা, খনার বচন

--- ১৩ জুন, ২০১৪

রেশমা ইয়াসমিন ॥ আলো হাওয়া বেঁধো না রোগে ভোগে মরো না। মঙ্গলে ঊষা বুধে পা, যথা ইচ্ছা তথা যাও কিংবা ‘কলা রুয়ে না কাটো পাত তাতেই কাপড় তাতেই ভাত’ অথবা ‘বেঙ ডাকে ঘন ঘন, শীঘ্র হবে বৃষ্টি জান’ বা ‘বামুন বাদল বান, দক্ষিণা পেলেই যান’ জন্ম-মৃত্যু-বিবাহ তিন না জানেন বরাহ। কী কর শশুর লেখা-জোখা? মেঘের মধ্যেই জলের রেখা এগুলো জনপ্রিয় খনার বচন। জন-মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত এরকম বহু খনার বচনের সাথে আমরা পরিচিত। কিন্তু প্রশ্ন হল খনা নামে কেউ কি আদৌ ছিলেন। গ্রামে গঞ্জে প্রবীন গুরুজনেরা এখনো খনা’র কালজয়ী বচনের মাধ্যমে অন্যদেরকে জ্ঞানদান করে থাকেন। জলবায়ু ও প্রকৃতির সাথে কৃষির নিবিড় সম্পর্ক অনস্বীকার্য্য। এই সম্পর্কগুলো খনার বচনের মধ্য দিয়ে যে অব্যর্থতা পেয়ে গেছে, তাকে কালোত্তীর্ণের মর্যাদা না দিয়ে উপায় নেই। মূলত খনার ভবিষ্যতবাণীগুলোই খনার বচন নামে বহুল পরিচিত। এই বচনগুলো চার ভাগে বিভক্ত- ১-কৃষিকাজের প্রথা ও কুসংস্কার।
২-কৃষিকাজ ও জ্যোতির্বিজ্ঞান। ৩-আবহাওয়া জ্ঞান। ৪-শস্যের যতœ সম্পর্কিত উপদেশ। মনে করা হয় ৮০০ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তার আবির্ভাব হয়েছিল। কিংবদন্তি অনুসারে তিনি বাস করতেন পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার বারাসাতের দেউলি গ্রামে।  ভক্ষনে জন্মগ্রহণ করায় তাঁর নাম রাখা হয় ক্ষনা বা খনা। তার পিতার নাম ছিন অনাচার্য। চন্দ্রকেতু রাজার আশ্রম চন্দ্রপুরে তিনি বহুকাল বসবাস করেন। অন্য একটি কিংবদন্তী অনুসারে তিনি ছিলেন
সিংহলরাজের কন্যা। বিক্রমপুরের রাজা বিক্রমাদিত্যের রাজ সভার প্রধান জ্যোতির্বিদ বরাহ এর পুত্র মিহিরকে খনার স্বামীরূপে পাওয়া যায়। কথিত আছে বরাহ তার পুত্রের জন্ম কোষ্ঠি গণনা করে পুত্রের আয় এক বছর দেখতে পেয়ে শিশু পুত্র মিহিরকে একটি পাত্রে করে সমুদ্রেও জলে ভাসিয়ে দেন। ভাসমান তাম্র-পাত্র সিংহল দ্বীপে পৌছলে সিংহলরাজ শিশুটিকে তুলে নেয় এবং নিজ কন্যা শিশু খনার সাথে পালন করতে থাকে। খনা ও মিহির কালক্রমে জ্যোতিষ শাস্ত্রে দক্ষতা অর্জন করেন এবং যৌবনে পরস্পর পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। খনা ভূগোল শাস্ত্রেও পারদর্শী হয়ে ওঠেন।
একদিন খনা ও মিহির গণনায় অবগত হন যে, মিহির জ্যোতির্বিদ বরাহের পুত্র। এক মাহেন্দ্রক্ষণে উভয়ে ভারতবর্ষে যাত্রা করেন। বিক্রমপুরে  এসে খনা ও মিহির পন্ডিত বরাহের নিকট আত্মপরিচয় দেন। কিন্তু পন্ডিতসে কথা বিশ্বাস করতে চাইলেন না। কারণ তিনি গণনা দ্বারা জানতে পেরেছিলেন যে,এক বছর বয়সেই তাঁর পুত্র মিহিরের মৃত্যু ঘটবে।
খনা তখন তাঁর একটি বচন উদ্ধৃতি দিয়ে শ্বশুরের ভুল গণনা প্রতিপন্ন করেন- ‘কিসের তিথি কিসের বার, জন্ম নক্ষত্র কর সার কি করো শ্বশুর মতিহীন, পলকে আয়ু বারো দিন।’ অর্থাৎ এ গণনায় মিহিরের আয়ু ১০০ বছর। পন্ডিত বরাহ সানন্দে খনা ও মিহিরকে স্বগৃহে গ্রহণ করেন। কালক্রমে মিহির বিক্রমাদিত্যের সভাসদ হন। একদিন স্বশুর বরাহ এবং স্বামী  মিহির আকাশের তারা গণনায় সমস্যায় পরলে, খনা এ সমস্যার সমাধান দিয়ে রাজা বিক্রমাদিত্যেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ক্রমে খনার অগাধ জ্ঞানের কথা জানাজানি হয়ে যায়।
রাজসভাতে তিনি আমন্ত্রিত হন।রাজা বিক্রমাদিত্য খনাকে দশম রতœ হিসেবে আখ্যা দেন। খনার জ্ঞান-গরিমা সভা-পন্ডিতদের ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এমনকি তিনি পন্ডিত বরাহের জ্যোতিষশাস্ত্রীয় বহু দুঃসাধ্য সমস্যা সমাধান করে দিতে লাগলেন। এতে অপমানিত ও ঈর্ষান্বিত পন্ডিত বরাহ পুত্র-বধুকে জিহ্বা কর্তন করে তাকে বোবা বানিয়ে দেয়ার জন্য পুত্রকে আদেশ করেন। মিহির খনাকে একথা জানান। খনা এ শাস্তি মেনে নেন। পিতৃ-আদেশে মিহির এক তীক্ষ্ণধার ছুরিকা দ্বারা খনার জিহ্বা কর্তণ করেন। এতে করে মাত্রাতিরিক্ত রক্তক্ষরণে অসামান্যা বিদূষী খনার মৃত্যু হয়। কথিত আছে খনার জীহ্বা কেটে নেয়ার জন্য তাঁর শাশুড়ির সাথে দ্বন্দও বিশেষ ভূমিকা পালন করে। খনার বচন বাংলার লোক সাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যান্ত্রিক জীবনের চরম অস্থিরতা আর পাশ্চাত্যেও হাওয়া আমাদেও ধীরে ধীরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে নিজস্ব সংস্কৃতির আংগিনা থেকে । ভুলে যাচ্ছি আমাদের মানুষদের মুখে মুখে প্রচারিত হয়ে আসা কিংবদন্তিতুল্য এক বিদূষী নারী খনাকে, যিনি নিজের  জ্ঞানের কথা ছড়ার ছলে ছড়িয়ে দিয়েছেন বাংলার কোটি কোটি মানুষের মুখে। “ঘরের কোনে মরিচ গাছ লাল মরিচ ধরে, তোমার কথা মনে হলে চোখের পানি পড়ে।

ফেইসবুকে আমরা

পুরনো সংখ্যা

সেপ্টেম্বর ২০১৮
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« আগষ্ট    
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০