November 19, 2018

বাবুগঞ্জে হারিয়ে যাচ্ছে দেশী প্রজাতির মাছ

--- ২৩ জুন, ২০১৭

আরিফুর রহমান।।বাঙালীর দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় এক সময় দেশী মাছের ছিলো সরব আয়োজন। দেশী মাছের ব্যাপক চাহিদা ও সহজলভ্যতার কারণেই বাংলার মানুষের ‘মাছে ভাতে বাঙালী’ বলে একটা বিশেষ পরিচিতি ছিলো। এ মাছের দুষ্প্রাপ্যতা ও চড়া দামের কারণে বাঙালী বর্তমানে হারাচ্ছে এ বিশেষ সুখ্যাতি। সারা দেশের মতো বাবুগঞ্জেও দেশী মাছের ব্যাপক আকাল লক্ষ্য করা গেছে। এ অঞ্চলে দেশী মাছ হ্রাস পাওয়ায় এখানকার মানুষ মাছের পুষ্টিমান থেকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছে। দক্ষিণের এ উপজেলায় রয়েছে দেশী মাছের বিভিন্ন বিচরণ ক্ষেত্র। তার মধ্যে বিল-বাওড়, পুকুর, ডোবা, রাস্তার পাশের নালা, সেচ খাল, ধানক্ষেত, প্লাবন ভূমির গর্ত উল্লেখযোগ্য। দেশী মাছের মধ্যে কাচকি, পুঁটি, সরপুঁটি, মলা, টেংরা, খলিসা, কৈ, মাগুর, শিং, টাকি, পাবদা, চেলা, শোল, গজার, ফলি, চিতল, বাইন ও ভেদা ইত্যাদি মাছের ব্যাপক বংশ বৃদ্ধি হতো এ সকল স্থানে। মানুষের শরীরে পুষ্টির চাহিদা পূরণে এ মাছগুলোর ভূমিকা অপরিসীম। পর্যাপ্ত মাছের সরবরাহ থাকায় পল্লী এলাকার বিভিন্ন বাজার থেকে মানুষ দেশী মাছ কিনে খাবার চাহিদা মেটাতো। তাছাড়া গৃহস্থ বাড়ির জোয়ানরাও নেমে পড়তো মাছ শিকারে। নিজেদের পলো, জাল, বড়শি দিয়ে ওই সকল মাছ শিকার করতো তারা। বছরের মে থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত দেশী মাছের সরবরাহ ছিলো সবচেয়ে বেশি। সময়ের বিবর্তনে এসব মাছ এখন বিলুপ্তির পথে। মৎস বিজ্ঞানীরা এক গবেষণায় এর কারণ হিসেবে জলবায়ুর পরিবর্তন, খাল বা পুকুর সংলগ্ন ধান ক্ষেতে ক্ষতিকর কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহার, লবণাক্ততা, ডিমওয়ালা মাছ শিকার, জলাশয় ও পুকুরে মাটি ভরাট, নাব্যতা হারানো, মাছের নিরাপদ প্রজনন ক্ষেত্রের সঙ্কট, পলি জমে খাল সরু হওয়া ও কারেন্ট জালের ব্যবহারকে চিহ্নিত করেছেন। ফলে একদিকে যেমন মৎসজীবীরা হারাচ্ছেন তাদের জীবিকার অবলম্বন, অন্যদিকে ক্রেতা সকল তাদের চাহিদা পূরণে হচ্ছেন ব্যর্থ। এমন অবস্থা দেখে চল্লিশ কিংবা ষাটের দশকের বুড়োদের মুখে প্রায়ই শোনা যায় আক্ষেপের কথা। তারা বলে থাকেন, ‘হায়রে কপাল! কলির কালও আইলো আর মাছগুলাও দ্যাশে গোনে চইল্লা গ্যালো।’স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মো. আনোয়ার হোসেন জানান, দেশী মাছে কম চর্বি থাকায় সকলের কাছে এ সকল মাছ বেশি গুরুত্ব পায়। এসব মাছে রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, জিংক ও আয়রন। এছাড়া রয়েছে মানব দেহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ্যামাইনো এসিড। যা কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। ‘খাদ্য ও কৃষি সংস্থা’র প্রদত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব দেশী মাছে বিদ্যমান রয়েছে ৭২ ভাগ পানি, ১৯ ভাগ প্রোটিন, ৮ ভাগ ফ্যাট, ০.১৫ ভাগ ক্যালসিয়াম, ০.২৫ ভাগ ফসফরাস ও ০.১০ ভাগ ভিটামিন এ, বি ও ডি।

 

গর্ভবতী মায়ের বাচ্ছার পুষ্টি, শিশুর দাঁত ও হাড় মজবুত করতে এসব মাছের ভূমিকা অত্যন্তু গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া মা-শিশুর রক্ত স্বল্পতা দূর করতে টাকি, শিং ও মাগুর মাছ খেতে পরামর্শ দেন বিজ্ঞ চিকিৎসক। এদিকে মলা মাছ ‘টনিক ফিস’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। এ মাছে ভিটামিন ‘এ’ পর্যাপ্ত পরিমাণ বিদ্যমান। শিশুর রাত কানা রোগ নিরাময়ে এ মাছের তুলনা হয় না। এ মাছের ৫৩ ভাগ ভিটামিন আসে মাথা ও চোখ থেকে এমন তথ্য দিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। দুঃখজনক যে, এ সকল দেশী মাছ এখন বিরল প্রজাতির মর্যাদা অর্জন করেছে। চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্রে এসব মাছের নির্দেশনা দিলেও বাজারে এ মাছের দুষ্প্রাপ্যতায় টাকাওয়ালার বুকও শুকিয়ে যায়। আর গরীবদের কথা বলাই বাহুল্য। মৎস ব্যবসায়ী জামাল হাওলাদার দেশী মাছের আকাল সম্পর্কে বলেন, ‘এ্যাক সোমায় দেশী মাছ বেইচ্যাই আয় অইতো। সোংসার চালাইতাম। তহন মাছও পাওয়া যাইতো ম্যালা। এহন মাছ ধরতে গ্যালে মাছ পাই না। ঠিক হরছি, প্যাট বাঁচাইতে ঢাহা যামু।’পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট’ ডিপার্টমেন্টের সহকারি অধ্যাপক ড. ফেরদাউস আহমেদ’র সাথে মোবাইল ফোনে আলাপকালে দেশী মাছ সংরক্ষণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘দেশী মাছ সংরক্ষণ করতে হলে মাছের প্রজনন মৌসুম বৈশাখ থেকে আষাঢ় পর্যন্ত মাছ ধরা বন্ধ রাখতে হবে। পানি সেচ দিয়ে জলাশয়ের মাছ ধরা থেকে সবাইকে নিরুৎসাহিত করতে হবে। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মাছের বংশ বিস্তারে এগিয়ে আসতে হবে সকলকে। ফাঁস জাল দিয়ে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকতে হবে। এ ছাড়াও জলাভূমির কিছু অংশ খনন করে মা মাছকে সংরক্ষণ করতে হবে। গ্রামের লোকজনকে দেশী মাছের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করা প্রয়োজন। তাদেরকে সংরক্ষণ কাজে সম্পৃক্ত করতে পারলে দেশী মাছ সহজলভ্য হয়ে ওঠবে বলে আমার বিশ্বাস।’দেশী মাছে পুষ্টিমান বেশি থাকায় এ মাছের কদরও বেশি। খাল-বিলের পানি দূষণ রোধ করে তৈরি করতে হবে দেশী মাছের অভয়াশ্রম। সকলের সচেতনতা ও দেশী মাছ সংরক্ষণের ফলে আবারও ফিরে আসবে বাঙালীর সেই হৃত সুখ্যাতি।#

ফেইসবুকে আমরা

পুরনো সংখ্যা

নভেম্বর ২০১৮
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« অক্টোবর    
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০