November 13, 2018

বিল ডাকাতিয়ার বিলে বাবার কোলে ঘুমাও তাজ-

--- ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

লিটন বাশার ॥ আমি তখন দেশের একমাত্র গাঙ্গেয় অববাহিকার দ্বীপজেলা ভোলার বাসিন্দা। জিএম বাবর আলী পোশাকী নামের এ মানুষটি আমাদের সকলের প্রিয় মুখ। এক নামের আমরা যারা তরুন বয়সে সাংবাদিকতায় যোগ দিয়েছি তারা বাবর ভাই সম্মোধন করি। চাকুরীর কারনে তিনি তখন আমার সরাসরি বস.। তবে তার সাথে সম্পর্কটা ধীরে ধীরে পারিবারিক থেকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে বন্ধুর মত মধূর হয়ে উঠেছিল।  ভোলায় বসে একদিন পত্রিকার খবর পড়ে জানলাম বাবর ভাই’র জেষ্ট্য ছেলে জিলা স্কুলের মেধাবী ছাত্র সৈকত এক মর্মান্তিক  দূঘর্টনায় মারা গেছে। খুলনা শহরের বয়রা এলাকায় নানার বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে অকালে হারিয়ে যায় সৈকত। বাবর ভাই পুত্র শোকে একেবারে ভেঙ্গে পরলেন। কাবু হয়ে গেলেন। যতটা জানি সেই থেকেই তার ছন্নছাড়া জীবনের হাতছানি দিয়েছিল। তাদের সংসারে তখন নতুন অতিথি হয়ে আসে জিএম মমিনুল ইসলাম তাজ। তাজের বয়স যখন ২/ ৩ বছর তখনই আমি সম্ভবত প্রথম দেখেছিলাম। এত সুন্দর ফুটফুটে শিশু পৃথিবীতে খুব কম আসে। বাবর ভাই’র সংসার আলোকিত করে আসা সাদা ধবধবে ছেলেটি যে কারো নজর কাড়বেই। যারা সুন্দরকে ভালবাসেন তাদের নজর কাড়তে বাধ্য তাজ। এত মিষ্টি মধুর আদুরে চেহারার ছেলেটিকে ভাল না বেসে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কোন উপায় কারো নেই।  তাজকে আদর সোহাগে আগলে রাখা লোকদের মধ্যে আমিও একজন হলাম। ছোট্ট তাজকে সুন্দর পোষাকের সাথে চোখে কালো সানগ্লাস পড়িয়ে ¯প্রীডবোর্টে নিয়ে আমরা কত বার যে ভোলায় যাতায়াত করেছি তার কোন শেষ নেই। এরপর জল গড়িয়েছে নানান গাঙ্গে। মেঘনার ঘোলা জলে বানভাসী মানুষের মত আমি রাজধানী ঢাকা ঘুরে শ্যাওলার মত আবার ঠাই পেলাম এই বরিশাল নগরীতে। গাঙ্গের পানির মত সময়ও গড়িয়েছে বেশ। ছোট্ট তাজ ধীরে ধীরে বড় হত লাগলো। কনিষ্ট পুত্র থেকে বাবর দম্পত্তির মেঝ পুত্র বনে গেল ছোট ভাই তানিমের জন্মের পর। সুকান্ত’র কবিতার মত এসেছে শিশু তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান। তাই তাজের আদরের জায়গাটি যথারীতি ছোট ভাই তানিমের দখলে চলে গেল। যদিও হাজারো ব্যস্ততায় বাবর ভাই’র বাসায় যাতায়াতের বিষয়টা আমার সীমিত হয়ে উঠে। তবুও তাজ- তানিমের সাথে মাঝে মধ্যে প্রায়ই দেখা হতো। দুষ্টমীর ছলে ওদের সাথে নানান বিষয়ে কথা হতো। ওদের ভবিষ্যত জীবন নিয়ে বাবর ভাই’র সাথে প্রায়ই কুশল বিনিময় হতো।
গত কয়েক বছর পূর্বে বাবর ভাই’র নিজের জীবনের সংকট খুবই ঘনিভূত হতে থাকে। বিষন্নতা তাকে ঘিরে ধরেছিল। প্রায়ই তার খুবই বিমর্ষ, মলিন অসহায় চেহারাটা ধরা পরতো আমাদের চোখে। যে দক্ষ, অভিজ্ঞ মানুষটি একটি দৈনিক পত্রিকার সব দিক গুছিয়ে পাঠকের কাছে উপস্থাপন করতেন সেই মানুষটি’র ভিতরটা যেন খুব এলোমেলো হয়ে উঠেছিল। আমাদের পেশাগত অসুস্থ প্রতিযোগিতায় বাবর ভাই যেন বার বার হেরে যাচ্ছিলেন।  ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও আর্থিক সংকট সহ নানান সংকটে নিমজ্জিত বিনয়ী এ মানুষটির মুখে তবুও সারাদিন লেগে থাকতো চিরায়ত হাসি। হাল জমানার বে-দরকারী টেলিভিশন চ্যানেল কিংবা বাহারী নামের নতুন নতু দৈনিক পত্রিকা নিয়ে বাবর ভাইকে আর কখনো স্বতস্ফুর্ত হতে দেখিনি। টিভি, পত্রিকা কিংবা প্রেসক্লাব নিয়ে তার কোন কৌতুল ছিল না। বরং হতাশার সুরে প্রায়ই বলতেন ‘ সেদিন আর নেই রে লিটন, আগে আমরা পরস্পরকে নিয়ে ভাবতাম। একের অপরের জন্য জান প্রান দিয়ে দিতাম। এখন আমরা যার যার স্বার্থের কারনে অন্যের ক্ষতি করতেই বেশী অভ্যস্থ হয়ে উঠেছি।
হাজারো দু:খ কষ্ট বুকে চাপা দিয়ে জীবন সংগ্রামে হেরে যেতে তিনি নিজেই স্বেচ্ছায় গত ২ মে এ নশ্বর ধরাধাম ছেড়ে গেছেন। সেই শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই তার সেই আদরের সন্তান জিএম মোমিনুল ইসলাম তাজ একই ভাবে বাবার পথ অনুসরন করে গলায় ফাস দিয়ে নিজের অতি ক্ষুদ্র জীবনের যবনিকাপাত ঘটালো। গত শুক্রবার ২৯ আগষ্ট খুলনার শহরের বয়রাস্থ নিজ বাসায় তাজের এ অভিমানী বিদায়ের কথা শোনার পর আমার মত অনেকেরই হৃদয়ে রক্তক্ষরন শুরু হয়েছে। এমন কি ঘটলো তার এই ছোট্ট জীবনে। এই শিশু বয়সেই নিজের জীবনের বোঝা নিজে বইতে না পেরে অকালেই ঝরিয়ে দিল ফুলের মত নিস্পাপ জীবন। যে বয়সে তার দু’ চোখ ভরা স্বপ্ন থাকার কথা, সেই বয়সেই তার হৃদয়ে হতাশার বিষবৃক্ষ বিস্ফোরন ঘটালো। এটার জন্য তার পরিবার বিশেষ করে-বাবা, মা ও আমাদের সমাজ ব্যবস্থা কম দায়ী নয়।  খুব কাছ থেকে দেখা অতিপ্রিয় তাজের এ করুন অকাল প্রয়ানের খবর আমাকে ব্যথিত করেছে। তার চাঁদবদন খানা শেষ বারের মত দেখার জন্য পরদিন ৩০ আগষ্ট খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার থুকড়া গ্রামে ছুটে গিয়েছিলাম। আমাদের চোখের সামনেই ছোট্ট তাজকে শেষ গোসল করানো হলো।  শেষ সাজ-সজ্জায় সাজিয়ে দেয়া হলো। আমরা আমাদের অনিচ্ছার যাতাকলে পৃষ্ট হয়ে নিয়তির কাছে হার মানলাম। বাধ্য হলাম তাকে শেষ বিদায় জানাতে। ছোট্ট কিশোর তাজকে নিজেদের হাতে সমাহিত করলাম তার জন্মদাতা পিতা জিএম বাবর আলীর কবরের পাশে। যে কবরটি গত চার মাস পূর্বে নিজ চোখে তৈরী করতে দেখেছিল তাজ। সেই কবরটির কোল ঘেষেই যে তাকে মাত্র ১১৯ দিনের মাথায়  শায়িত হতে হবে তা হয়তো তাজ নিজেও কল্পনা করতে পারেনি। আমরা কেউ ভূলেও এমন ভূল ভাবনার ধারে কাছে ছিলাম না। তবুও নিয়তির অমেঘ নিয়ম মেনে নিয়ে তাজকে চিরদিনের জন্য রেখে এলাম তার বাবার কোলে। সেখানে যেন শান্তিতে থাকে আমাদের আদরের নম্র ভদ্র বিনয়ী তাজ। পড়ন্ত বিকালে যখন বিল ডাকাতিয়ার বিলে ঘেরা গ্রাম থুকড়া ছেড়ে বরিশালের উদ্দেশ্যে রওয়ান হলাম  তখন শুধুই বুকের ভিতর বোবা কান্নার সুর। সেই বুকের কান্নায় কামনা করছিলাম- তাজ বাবা, তুমি তোমার আব্বুর কোলে শান্তিতে ঘুমাও। এ ধরার বুকে তোমাকে বা তোমার বাবাকে আমরা ধরে রাখতে পারলাম না। এ আমাদের এক চরম ব্যর্থতা। এ ব্যর্থতার দায়ভার থেকে তোমরা আমাদের ক্ষমা করে দিও। তোমার মত এমন জীবনাবসানের সর্বনাশা পরিস্থিতি যেন আর কাউকে কখনো মুখোমুখি হতে না হয়।

ফেইসবুকে আমরা

পুরনো সংখ্যা

নভেম্বর ২০১৮
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« অক্টোবর    
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০