বৈশাখে সেজেছে বরিশাল

আসমা আক্তার   কালের যাত্রা নিরন্তর, নিরবধি। মহাকালের রথ সেই পথযাত্রায় পেরিয়ে গেল ১৪১৯ বাংলা বর্ষের সীমারেখা। আজ রবিবার পয়লা বৈশাখ, বঙ্গাব্দ ১৪২০। নতুন বছরের পরিক্রমা শুরু হলো বাঙালির নিজস্ব বর্ষপঞ্জিতে। বাংলা ভাষাভাষীর জীবনে এল এক অমলিন আনন্দের দিন। আজ বৈশাখী উৎসব।
আজ এক প্রেরণার দিনও। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ এক অভিন্ন হূদয়াবেগ নিয়ে মিলিত হবে একই উপলক্ষে। পয়লা বৈশাখ ছাড়া এত বড় সর্বজনীন উৎসবের উপলক্ষ আর নেই। এই উৎসবের মধ্য দিয়ে বাঙালি তার আপন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আলোকে জাতিসত্তার পরিচয়কে নতুন তাৎপর্যে উপলব্ধি করে গৌরব বোধ করে। এই গৌরব ও চেতনাই বাঙালিকে প্রেরণা জুগিয়েছে আপন অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে। নানা বয়সী মানুষ সাড়ম্বরে উৎসবের আনন্দে মেতে উঠবে। পোশাক-পরিচ্ছদ, খাওয়াদাওয়া, গানবাদ্য সবকিছুতেই প্রাধান্য পাবে বাঙালিয়ানা। আড্ডা, আমন্ত্রণ, উচ্ছ্বাসে কেটে যাবে দিনটি। বিশেষত নগরীর নাগরিকদের গৎবাঁধা জীবনযাত্রায় যোগ হবে ভিন্নতার স্বাদ। সকালেই নগরবাসী ঘর থেকে বেরিয়ে পড়বে সুসজ্জিত হয়ে। নারীরা পরবেন লাল-সাদা শাড়ি, পুরুষের পরনে নকশা করা পাঞ্জাবি ও ফতুয়া। বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকবে গালে, বাহুতে আলপনা আঁকা ফুটফুটে শিশুরা।
বাংলা সনের প্রবর্তন কবে হয়েছিল, কে তার প্রবর্তক, তা নিয়ে পক্তিতমহলে আছে নানা বিতর্ক। বেশির ভাগ মানুষেরই মত, মোগল সম্রাট আকবর এর প্রবর্তক। তিনি ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে, হিজরি ৯৬৩ সালে যে ‘তরিক-ই-ইলাহি’ নামের নতুন সনের প্রবর্তন করেছিলেন দিল্লিতে, তখন থেকেই আঞ্চলিক পর্যায়ে বাংলা সনের গণনা শুরু হয়েছিল। তবে রাজা শশাঙ্ক, সুলতান হোসেন শাহ ও তিব্বতের রাজ স্রংসনকেও বাংলা সনের প্রবর্তক বলে মনে করেন কেউ কেউ। ‘সন’ শব্দটি আরবি এবং ‘সাল’ শব্দটি ফারসি। এই শব্দ দুটির কারণে বাংলা সন বা সাল মুসলিম শাসকদেরই প্রবর্তিত বলে পন্ডিতেরা মনে করেছেন। বৈদিক যুগে অঘ্রানকে বছরের প্রথম মাস বলে গণ্য করা হতো। তবে এই অঞ্চলের চাষাবাদের সঙ্গে মিলিয়ে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে ফসলি সন হিসেবে বৈশাখকেই বছরের প্রথম মাস ধরে বাংলা সনের গণনা শুরু হয়েছিল। সুবাদার মুর্শিদ কুলি খানের সময়ে বৈশাখ মাসের শুরুতে খাজনা আদায়কে কেন্দ্র করে পয়লা বৈশাখে এক ধরনের আর্থসামাজিক আনন্দ-উৎসবের সূচনা হয়েছিল বলে গবেষকেরা মনে করেন।
বছরের প্রথম দিনে আনন্দ-উৎসবের মধ্য দিয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার রীতি-রেওয়াজ মানবসমাজে সুপ্রাচীন। কৃষিপ্রধান বাংলায় খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে বছরের প্রথম দিনে পুণ্যাহের আয়োজন করতেন রাজা বা জমিদারেরা। প্রজারা এ দিন খাজনা দিয়ে নতুন বছরের জন্য জমির পত্তন নিতেন। জমিদারেরা প্রজাদের জন্য আয়োজন করতেন ভোজের। চিত্তবিনোদনের জন্য যাত্রা, পালা, টপ্পা, গম্ভীরা, বাইজি নাচের সঙ্গে থাকত কৃষি ও কারুপণ্য নিয়ে মেলার আয়োজন। ঘোড়দৌড় বা গরুর গাড়ির দৌড়ের প্রতিযোগিতা করা হতো কোনো কোনো গ্রামে। পুণ্যাহ অনুসরণে অচিরেই আরও একটি অনুষ্ঠানের সংযোগ ঘটেছিল পয়লা বৈশাখে; সেটি হালখাতা। ব্যবসায়ীরা এর আয়োজন করতেন। সাংবৎসরিক যাঁরা বাকিতে কেনাকাটা করতেন, তাঁদের আমন্ত্রণ জানানো হতো। উত্তম আহারাদির বন্দোবস্ত করা হতো। দোকানঘরটি ধুয়েমুছে করা হতো ঝকঝকে। ছিটানো হতো পঞ্চবটীর পাতা ভেজানো পবিত্র জল। আপ্যায়ন শেষে পুরোনো বাকি শোধ করে খাতকেরা আগামও কিছু জমা করে যেতেন নতুন খাতায়। পুণ্যাহ ও হালখাতা ছিল মূলত অর্থনীতিনির্ভর অনুষ্ঠান। ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে পুণ্যাহ আয়োজন বন্ধ হয়ে যায় এবং হালখাতাও তার জৌলুশ হারাতে থাকে।
প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্যে পয়লা বৈশাখ উৎসবের কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। বাঙালির বৈশাখী উৎসব একেবারেই আধুনিক কালের সংযোজন। বিশেষত, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর গান ও কবিতায় বৈশাখকে তুলে ধরেছেন নতুন রূপে। খরতপ্ত বৈশাখের অন্তর্নিহিত শক্তিকে আহ্বান করেছেন জীর্ণ পুরোনোকে সরিয়ে দিতে। তিনিই বৈশাখকে চিরকালের জন্য বাঙালির চেতনায় স্থান করে দিয়ে গেছেন সৃজন, নবীনতা, প্রেরণা ও আনন্দের অনিঃশেষ উৎস হিসেবে।
ব্রিটিশ শাসন অবসানের পর সেই চেতনা বাঙালিকে উদ্বুদ্ধ করেছে পাকিস্তানি শোষণ-শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামে। অতীত ঐতিহ্যের গৌরব, সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগ, জাতিসত্তার চেতনা পয়লা বৈশাখের উৎসবকে নানা পরিবর্তনের মধ্যে পরিণত করেছে বাঙালির জীবনের প্রধান উৎসবে।
আজ সরকারি ছুটি। পত্রপত্রিকাগুলো নববর্ষ উপলক্ষে প্রকাশ করেছে বিশেষ সংখ্যা। বেতার ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলো সম্প্রচার করছে বিশেষ অনুষ্ঠান।
বরাবরের মতো বাংলা নববর্ষকে বরন করার জন্য এখানে সাংস্কৃতিক সামাজিক সংগঠন ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও বরিশালে নতুন বছরের নতুন সূর্য উঠবে উদীচী ও বরিশাল নাটকের যৌথ আয়োজনে ব্রজমোহন বিদ্যালয়ের তমাল তলায় প্রভাতী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। প্রভাতী অনুষ্ঠানের পর এখানেই অনুষ্ঠিত হবে রাখি বন্ধন উৎসব। পরে এ মাঠ থেকে বের করার হবে সার্বজনীন বৈশাখী মঙ্গল শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রাকে আকর্ষণীয় ও বর্ণাঢ্য করার জন্য শিল্পীদের হাতে বানানো বিভিন্ন ধরনের পশু পাখির প্রতিকৃতি, মুখোশ, মুকুট, হাতপাখা, রাজকীয় পাখা সহ ৩০টি ঢোল, ব্যান্ডদল সহ অন্যান্য বিষয়কে যুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও দিনটিতে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাং®কৃতিক অঙগএনর নেতৃবৃন্দ, সংগঠক, মুক্তিযোদ্ধা সহ সকলের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সকল ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। বরিশাল প্রেসক্লাবের উদ্যোগে সকালে অশ্বিনী কুমার হলে শিশু-কিশোরদের চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। প্লানেট ওয়াল্ড শিশু পার্কেও অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। আমনতগঞ্জ চাঁদেরহাটের উদ্যোগে আমনতগঞ্জ টিবি হাসপাতাল মাঠে তিন দিনব্যাপী মেলা অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া অন্যান্য সামাজিক সাং®কৃতিক সংগঠনও পৃথক পৃথক কর্মসূচী পালন করবে বলে জানা গেছে।