September 22, 2018

ভাবনার নগরদোলায়! লুঙ্গি ড্যান্স

--- ৩১ অক্টোবর, ২০১৪

লিটন বাশার ॥ গত রবিবার রাতে বৃষ্টি হইয়াছে। পরদিন মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। এরপর সোমবারও মেঘলা দিনে সূর্য্যরে দেখা মিলিলো না। সাথে উত্তরের হিমেল হাওয়ায় ঠান্ডা পরশ বুলিয়ে জানান দিচ্ছিল শীতের আগমনী বার্তা। ঋতু পরিবর্তনের এ সময়টাই বোধ করি সকলেরই মনের মধ্যে কিছুটা প্রভাব বিস্তার করিয়া থাকে। মানুষ্য জীবের মধ্যে আমিও ইহার বাহিরে নই। কিন্ত শীতের এ আগাম আগমনী খবরে খুশী হইতে পারিলাম না। ঋতু রদ-বদলের ধাক্কায় আমাদের দেশের বৃষ্টিপাত এতই কমিয়া গিয়াছে যাহা উদ্বেগ আকার ধারন করিয়াছে দখিন উপকূলের মানুষের জন্য। তাই উত্তরের হাওয়ায় এখন আর মায়াবী পরশ খুজিয়া পাইলাম না। উত্তরের হাওয়ায় ঠান্ডা পরশ বুলাইবার পূর্বেই আবহাওয়া দপ্তর হইতে যে খবর পাইলাম তাতে উদ্বিগ্ন না হইয়া কোন উপায় থাকিবার কথা নহে।
আবহাওয়া বিভাগ সূত্রের মতে, স্বাভাবিক অপেক্ষা ২০-২৫ ভাগ কম বৃষ্টিপাতের মধ্য দিয়েই ঘূর্ণিঝড় ‘হুদহুদ’ এর হাত ধরে সারাদেশ থেকে এবারের বর্ষা মৌসুমের বিদায় ঘটিয়াছে। চলতি বছরের শুরু থেকেই সারাদেশে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কিছুটা কম ছিলো। গত জানুয়ারি মাসে বরিশাল অঞ্চলে ৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হইবার কথা থাকিলেও কোনো বৃষ্টিপাত হয় নাই । ফেব্র“য়ারি মাসেও বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল গত বছরের তুলনায়  ১৮ শতাংশ কম। মার্চ মাসে এ অঞ্চলে বৃষ্টি হইয়াছে মাত্র ৮ দশমিক ৮ মিলিমিটার। অথচ স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের নির্ধারিত পরিমাণ ছিল ৫৩ মিলিমিটার। মার্চ মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৮৩ দশমিক ৮ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হইয়াছে। এপ্রিলে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৯৫ শতাংশ বৃষ্টিপাত কম হইয়াছে।  এপ্রিল মাসে  স্বাভাবিক বৃষ্টি হওয়ার কথা ছিলো ১৩২ মিলিমিটার। অথচ এপ্রিল মাসে মাত্র ৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হইয়াছে। মে মাসে সারাদেশেই সামগ্রিকভাবে প্রায় ৭৯ শতাংশ কম বৃষ্টি হইয়াছে। জুন মাসে বরিশালে স্বাভাবিক অপেক্ষা ২০ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হইয়াছে। পাশাপাশি জুলাই মাসে ১৮ শতাংশ এবং  আগস্ট মাসে বরিশাল অঞ্চলে ১১ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হইয়াছে।
২০০৭ সালের প্রলয়ংকরী ঘুর্নিঝড় সুপার সাইক্লোন সিডরের পর থেকেই গড়ে প্রতি বছর ১৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত কম হইতেছে এই জনপদে। এর প্রভাব পরিয়াছে কৃষি ও জীব বৈচিত্র্যের উপর। দেশী প্রজাতির মাছ হারাইয়া যাইতেছে। বৃষ্টিপাত কম এবং শীতের আগাম পরশে বদলাইয়া যাইতেছে প্রকৃতি নির্ভর চাষাবাদ। ঋতুর এ রদ-বদলে ক্ষতিগ্রস্থ হইতেছে  কৃষি নির্ভর এ অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ। তাহারা প্রকৃতির এ ধরন বুঝিয়া  উঠিতে পারিতেছেন না।
পরিবেশ বিষেজ্ঞ ড. আইনুন নিশাদ প্রকৃতির এ বৈচিত্র সম্পর্কে বলেন শুধু চাষাবাদ নহে, প্রকৃতিগত ভাবে যে সব ফলমুল উৎপাদন হয় তাহাও ব্যাহাত হইতেছে কারন যে ফুল ফোটার পর ছোট প্রানীরা তাহার পরাগ রদ-বদল ঘটাইয়া প্রজননের মাধ্যমে উৎপাদন সক্ষম করিয়া তোলে  দেখা যাইতেছে সেই সব বন্য প্রজাতির এখন পর্যন্ত আগমনই ঘটে নাই। ফলে প্রানী নির্ভর এ সব প্রজাতির ফলজ উৎপাদন মারাতœক ভাবে ব্যাহাত হইবার  আশংকার কথা জানাইয়াছেন পরিবেশবিদগন। মৌ মাছি ও পোকা-মাকড়ের আবির্ভাবের আগেই ফুল কিংবা ফল ধরিলের তাহা পূর্নতা পাইতেছে না।
কৃষি উৎপাদনসহ নানান খাতে বিপর্যয়ের মুখে পড়া দক্ষিন জনপদে ২০০৭ সালের পর হইতে দিন দিন দারিদ্র্যের হার বাড়িতেছে। এই অঞ্চলের দরিদ্র্যপীড়িত মানুষ ভির জমাইতেছেন রাজধানী ঢাকা সহ দেশের বড় শহর গুলিতে। এই সব বড় শহর গুলো দ্বৈত চিত্র মানুষের জীবন যাত্রার বাস্তবতা ফুটাইয়া তুলিতেছে। রাজধানী ঢাকার সু-বিশাল অত্যাধুনিক অভিজাত মাকের্ট হইতে বাহির হইলেই রুগ্ন দু’টি হাত বাড়িয়ে বলছেন  ‘ বাবা দু’ টো টাকা দেন’  আব্বা আমার মেয়ে টা জন্ডিসে ভূগছে, চিকিৎসার পয়সা নাই’ ও বাবা তোর পায়ে পড়ি ১০ টা টাকা দে’ ঘরের চাল ফুটো হইয়া গেছে বৃষ্টি আর রৌদ আমাদের অবুঝ সন্তানদের মারি ফালাইতেছে’। এই সব আকুতির সাথে বোধ করি শীতের এই আগমন একটু গরম কাপুড়ের আকুতি বাড়াইবে বটে। এই সব হতদরিদ্র মানুষদের ঘরে ঘরে নতুন যাতনা শুরু হইবে শীত নিবারনের জন্য একটু গরম কাপড়ের অভাব।
শীতের ঠান্ডা, বর্ষায় ভেজা আর রৌদ্রের যাতাকলে পিষ্ট এসব মানুষের বারো মাসেই দেখা মেলে রাজধানীর শপিং মল গুলোর দরজা কিংবা নিকটবর্তী এলাকায়। তাহাদের করুন চোখের দৃষ্টিতে যে সব আকুতি মিনতির শব্দ উচ্চারিত হয় তাহার পাশঘেষেই  দাড়ানো সু- বিশাল অট্টালিকার হীমশীতল বাতাসে মেম সাহেবদের গলর্দঘর্ম কেনা কেটার দৃশ্য দেখিতে আমরা সকলেই যেন অভ্যস্থ হইয়া উঠিয়াছি। কালে ভদ্রে আমরা যারা রাজধানী মুখী হইয়া থাকি তাহাদের হৃদয়ে বিষয়টি রেখাপাত করিলেও যাহারা সারা বছর রাজধানীর অভিজাত এলাকায় ঘুরাঘুরি করেন তাহাদের জন্য হয়তো খুবই স্বাভাবিক দৃশ্য বা  বিষয় এটি।  আলো ঝলমলে বিপনী বিতান গুলোতে ঝকঝকে গাড়ী নিয়ে তকতকে ক্রেতারা ঢুকছেন। এদের কারো কাছেই টাকা পয়সা কোন বিষয় নহে। ভেনেটি ব্যাগ ভর্তি ক্রেডিট কার্ড, এটিএম, ভিসা কার্ড সহ নাম না জানা অগুণতি রসদ। এর উৎস আমরা জানি না। আর এ সব ক্রেতারা জানেন না অপচয় কাহাকে বলে, উহা কত প্রকার এবং কি কি!!!!, জানেন না রোজগার হালাল করার হিতোপদেশ।
তাহা হইলে আমরা যাহারা মাঝে মধ্যে রাজধানীর এই আলো ঝলমলে পরিবেশে গিয়া ক্রেতাদের সারিতে দন্ডায়মান হই তাহারা যাইবো কোথায়। চারদিকে এত কিছু দেখিয়া আমরা এখন বন্ধুর ছেলে- মেয়ের বার্থডে বা আতœীয় স্বজনের বিয়ের অনুষ্টানে যেতে রীতিমত হিমশিম খাইতেছি। আমাদের সু-শিক্ষার নীতি কাব্য কোথাও টিকিতেছে না। ‘ সদা সত্য বলিবে, সৎ পথে চলিবে ’ যেন আজ ব্যাকডেটেট।
এখন আধুনিকতার বদৌলতে জালের মত চারদিকে বিস্তার ঘটিয়াছে জুয়ারী, সুদখোড় ও ঘুষখোড়দের দৌড়ত্ব। তাহাদের অপ্রতিরোধ্য দাপটে আমাদের মত হত দরিদ্র পরিবার গুলোর জীবন প্রায় যায় যায় অবস্থা। এই প্রসঙ্গে আমাদের সাবেক আইজিপি মহোদয়ের একটা কথা বেশ মনে পড়ে। ওয়ান ইলেভেনের সময় তিনি বরিশাল কোতয়ালী মডেল থানার উদ্বোধন করিতে আসিয়াছিলেন। প্রধান অতিথির বক্তৃতা কালে তখন তৎকালিন আইজিপি নূর মোহম্মদ বিগত বিএনপি- জামায়াত আমলের লুটপাটের ইঙ্গিত করিয়া বলিয়াছিলেন ‘ মানুষ গুলো সব পাগল হইয়া গিয়াছিল, যাহার একটি বাড়ি আছে, তিনি আরো ৩ টি বাড়ির মালিক হইতে চাহিয়াছেন, যাহার একটি গাড়ি আছে তিনি ৫ টি গাড়ির মালিক হইয়াছেন। মানুষ গুলো যেন সব পাগল হইয়া গিয়াছিল, তাহাদের এ সব কীর্তিকলাপ যে কেউ পিছন থেকে দেখিতেছে তাহার কোন হুশ জ্ঞান ছিল না।’ সত্যি মানুষ পাগল না হইলে সকল লজ্জা-সরম পিছনে ফালাইয়া পাগলের মত টাকার নেশায় ছুটিতে পারিতেন না।  তাহাদের এসব টাকা অর্জনের মাধ্যম ও উপায় গুলো যে কেউ পিছন থেকে দেখিতেছেন সেই হুশ বোধ করি বর্তমানদের ধারনায় নাই। বরং বিএনপি-জামায়াত আমলের পর ওয়ান ইলেভেনের সময় যাহাদের দূর্ণীতির জন্য কারাগারে পাঠানো হইয়াছিল তাহারা যেন কারাগার হইতেই দূর্নীতির উপর উচ্চতর ডিগ্রী নিয়া ঘরের ছেলে ঘরে ফিরিয়া আসিয়াছেন। কেউ কারো চেয়ে এখন টাকা রোজগারে কম যাইতেছেন না। আমরা স্বল্প আয়ের মানুষ  গুলো সর্বদা নীতি কাব্যে ভজিয়া থাকি মনে করি এই জমানার পর ভাল লোকের আর্বিভাব ঘটিবে সকল অপকর্ম দূর না হইলেও কিছুটা পরিত্রান পাওয়া যাইবে।   কিন্ত বাস্তবে অবস্থার ক্রমবনতি ছাড়া উন্নতির কোন লক্ষন আমাদের চোখে পড়িতেছে না। যাত্রা, জুয়া, হাউজি, উলঙ্গ নৃত্যের তালে তালে সুদ- ঘুষ সমান তালেই বাড়িয়া চলিতেছে। এই অবস্থার উত্তোরন ঘটিবার কোন লক্ষনই আমাদের এই পোড়া চোখে পরিতেছে না।  সবকিছুই যেন হারাইতেছে নষ্টদের মাঝে। আকাশে-  বাতাসে নষ্টদের বিজয় উল্লাসের তোপধ্বনি।
আকাশ সংস্কৃতির নামে ডিশের অপসংস্কৃতি যেন আজ আমাদের দৃষ্টি শক্তি কাড়িয়া নিয়া অন্ধ করিয়া দিয়াছে। ভারতীয় সেই ষ্টার জলসা সহ নানান সিরিয়াল বাঙালী বধুদের শুধু সংসার ভাঙ্গিতেছে না। তাহাদের বয়ফেন্ডদের হাতে মিরপুরে স্বামীর খুন কিংবা পরকীয়ার বলি নববধূর লাশের দৃশ্য আমাদের বিবেককে মুহুর্তের জন্যও জাগ্রত করিতে পারিতেছে না। সৃষ্টির সেরা জীব দাবী করিয়া অবিবেচকের মতই আমাদের বিবেক ঘুমাইতেছে। নীতি আছে দূর্নীতিতে, বিবেক সুইয়া ঘুমায় অবস্থার মাঝেই আমাদের দিন গুলো পার হইয়া যাইতেছে। ভবিষ্যত হইতো আরো অন্ধকার। আলো নিশানা কোথাও দেখা যাইতেছে না।
এখন আর গ্রাম গঞ্জে সান বাধানো ঘাটে পূথি পাঠের আসর বসে না। কবি নজরুল আর জীবননান্দ যেন অভিমানে দেশ ছাড়িয়াছেন।  তাহাদের স্থান দখল করিয়া নিয়াছে:
লুঙ্গি ড্যান্স
লুঙ্গি ড্যান্স
লুঙ্গি ড্যান্স
লুঙ্গি ড্যান্স :
অথবা:
জুমে কি রাতমে
চুমকে বাত হায়
আল্লাহৃ বাচায়ে মুঝে
তেরে ওয়ারসে
ক্যাহতে হ্যায় হামকো পেয়ারসে ইন্ডিয়াওয়ালে
সুলেতে দিলকে তারসে
মুঝে কো থোরা রাউন্ড ঘুমাকে
আন্নাকে জ্যায়সা চশমা লাগাকে
কোকোনাটমে জারা লাচ্ছি মিলাকে
আজাও জারা মুড বানাকে
অল দা রাজনি ফেন থালাইবা
ডোন্ট মিস দা চান্স থালাইবা
এখন আর মাঝির কন্ঠে ভাটিয়ালী শোনা যায় না, অকুলও দরিয়ার মাঝে আমার ভাঙ্গা তরি/ অথবা মাঝি বাইয়া যাও, কূল নাই, কিনারা নাই , অথবা কোন পাড়ে তো বসত বাড়ি, কোন পাড়ে তোর বাসা। আব্বাস উদ্দিন, আব্দুল আলীমের কোন গানই এখন আর কোথাও শোভা পাইতেছে না। এ রকম হতাশার মাঝেই আমাদের অন্ধকার ভবিষ্যত যেন বাংলার সংস্কৃতিকেও লুট করে নিয়ে যাচ্ছে।

ফেইসবুকে আমরা

পুরনো সংখ্যা

সেপ্টেম্বর ২০১৮
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« আগষ্ট    
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০