November 14, 2018

মহাসেন দেখে হতবাক বনলতা সেন

--- ২১ মে, ২০১৩

লিটন বাশার ॥ ভয়াল ঘুর্নিঝড় সিডর, আইলা, নার্গিস ও সর্বশেষ মহাসেন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বদলে যাচ্ছে সবকিছুই। বাংলার শস্য ভান্ডার একের পর এক প্রাকৃতিক দূর্যোগে আক্রান্ত হয়ে হত দরিদ্র এলাকায় রুপ নিয়েছে। কৃষি প্রধান এ অঞ্চলের সেই রাখাল, বাঁশি আর বটবৃক্ষ এখন বয়সের ভারে নুয়ে পরা নূর বানুর কাছে শুধুই স্মৃতি। বাস্তবে তা হারিয়েছে অনেক আগেই।  এখন কবি সাহিত্যিকের লেখাতেও দখিনের সেই রাখাল বাঁশি, রাখাল বালক বা বটবৃক্ষের শীতল ছায়ার স্পর্শের কথা লক্ষ্য করা যায় না। কৃষকের সেই শস্যে ভরে থাকা মাঠের মধুময় বর্ণনা হয়তো আর কখনোই জানতে পারবে না আমাদের নতুন প্রজন্ম। যা হারায় তা অতীত হয়ে ইতিহাস হয়ে থাকে। মাঝে মধ্যে সেই ইতিহাস স্মৃতিময় হয়ে উঠে মানুষের মাঝে।  কিন্ত দখিনের হতভাগ্য দরিদ্র মানুষ গুলোর এমনই কপাল যে তাদের সেই জৈষ্ঠ মাসের আম , কাঠাল , বাজারের বড় ইলিশের স্বাধ গ্রহনের ভাগ্য এখন আর নেই।যে জৈষ্ট্যে নাওইরী আসার কথা নৌকায় চরে , আম – কাঠাল আর গরম ইলিশ – পোলাও দিয়ে জামাই ৬ষ্টীর আয়োজন করে তৃপ্তির ঢেকুর গেলার কথা সেই সময় আর্বিভাব হলো মহাসেন নামের ঘুর্নিঝড়।

 যে দু’টি চোখ ছিল পাখির বাসার মত ঠিক নাটোরের বনলতা সেন হয়ে তা ছানাবড়া হয়ে উদ্বেগ উৎকন্ঠায় কান্নায় হয়ে জলে ভাসালো। গোলবানুর মত বৃদ্ধরা  ১৯৭০ সালের বন্যা ও ১৯৯৬ সালের জলোচ্ছ্বাসের কথা স্মরন আনেন। তারা বন্যার কথা সাল বা সন গুনে বলতেই অভ্যস্থ। সিডর , আইলা, নার্গিস বা মহাসেন কি তা তারা বুঝে না। তাদের আমলে সেন ও পাল বংশ ছিল সেরা বংশ। গৌরব উজ্জ্বল ইতিহাস ছিলো এ অঞ্চলের মানুষের। হিন্দু- মুসলমানের মধ্যে তেমন কোন বিরোধ ছিল না।  অসাম্প্রদায়িক চেন্তা – চেতনার বসবাসকারী এ অঞ্চলে মানুষের মাঝে পঞ্চাশের দশকের শেষ ভাগেও বড় বড় গেরস্থ বাড়ীর গোয়ালে দেখা যেত দুধের গাভী। চাষাবাদ করবার জন্য ২০/২৫টি গরু ভর্তি গোয়ালঘর সম্পদশালী জমিদার পরিবারের ইঙ্গিত বহন করত। বাড়িতে বেতনভূক্ত কর্মচারীরা বছর চুক্তিতে নিয়োগ পেত। মৌখিক চুক্তি ভিত্তিক এ নিয়োগে বেতনও ছিল বছর ভিত্তিক। তবে তা টাকায় নয়। বেতন বলতে দেওয়া হতো আমনের মৌসুমে একমন ধান, বছরে দু’টি লুঙ্গী, একটি গামছা আর তিন বেলা মোটা চালের ভাত খাওয়া। কুঁড়ি-পঁচিশ বছরের সুঠাম দেহের রাখাল হলে মালিকের কাছে কদর পেত। তাদের ধানের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি দামি লুঙ্গী গামছা দেয়া হত। মাঝে মধ্যে খুশী হয়ে চপ্পলও (জুতা-স্যান্ডেল) দিতেন মালিক। তাদের ঘুমানোর জন্য নির্দিষ্ট জায়গা ছিল বাড়ির সামনে নির্মান করা কাচারী ঘর। সেখানেই রাখাল রাত্রি যাপন করতো। সাধারনত গোয়াল ঘরের কাছাকাছি এ কাচারী ঘর তৈরী করা হতো কারন রাতে চোরের হাত থেকে গরু রক্ষা পেতে এটা মালিকের কৌশল মাত্র।  রাখাল ধল-প্রহরের (অতি প্রত্যুষ) ঘুম থেকে উঠে গোয়াল ঘর থেকে গরু নিয়ে বের হতো। গ্রামের আঁকা বাঁকা মেঠো পথ পেরিয়ে গরু গুলিকে নিয়ে ছেড়ে দিত কোন এক খোলা মাঠে। সেখানে গরু  সামলানোর দুরূহ কাজটি সেরে ক্লান্তি মোচনের লক্ষ্যে রাখাল বসতো পার্শ্ববর্তী বিশাল বটবৃক্ষের নীচে।

গামছা দিয়ে ক্লান্ত ঘামযুক্ত  মুখ মন্ডল মুছে হাতের বাঁশের বাঁশিতে তুলতো করুণ সুর মুর্ছনা। “মন মাঝি তোর বৈঠা নেরে, আমি আর বাইতে পারলাম না” অথবা “কইন্যারে তোর পথের পানে চাইয়া চাইয়া”……..। মাঝি বাইয়া যাও……, তোমারও লাগিয়ারে..সদায়.প্রান আমার কান্দে বন্ধুরে….. ইত্যাদি   সুরের বাঁশি বাতাসে দোলা দিয়ে যেত গ্রামের পর গ্রাম। সে মিষ্টি সুর  পথচারীদের অন্তর ছুঁয়ে দুরের কোন দেহাতী যুবতীর হৃদয় পর্যন্ত স্পর্শ করত।.সেই নাটোরের বনলতা সেন এর মত দু’টি মায়াবী হরিনী চোখ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখতো রাখাল বালককে। কেউ কেউ প্রেমে পরে হাবু হাডু খেত। কৃষক রাখাল বালকের প্রেমের দৃষ্টান্ত রয়েছে হরেক।  দুপুর গড়িয়ে যাওয়ার পর সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়তো তখন সমস্ত আয়োজন শেষ করে রাখাল তার গুরুর পাল নিয়ে ফিরে আসতো নিজের আস্তানায়। গরু গুলো সব গোয়ালে এলো কিনা, রাখাল রাতের খাবার না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ল কিনা এই সব কিছুর খবরদারী করত গৃহকর্তারা। সনাতন ধর্মের অবতার শ্রীকৃষ্ণের পুত্র বেলার নাম ছিল গোপাল। গরুর পাল নিয়ে চড়ে বেড়াতেন বলেই তার নাম গোপাল হয়েছিল কিনা তা জানা যায়নি। তবে গাভীকূলকে তিনি অত্যন্ত ভালবাসতেন এবং গরুর দুধে তৈরী ননি ও ছানা ছিল তার প্রিয় খাবার। হিন্দু পুরানের একাধিক স্থানে এই কথার সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়। হিন্দু সম্প্রদায়ের বসবাসের মধ্য দিয়ে যে ভূ-ভাগে জনবসতি গড়ে উঠে সেখানে সনাতন ধর্মের জমিদারী প্রথা অর্ধশত বছর আগেও মহাজন ও চাষী কৃষক মজুরের মাঝে ঐতিহ্যের সেতু বন্ধন হয়েছিল। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে আজ যেন সব কিছু স্মৃতি হয়ে আছে। নদী ভাঙ্গনে গ্রামের সম্পদশালী পরিবারগুলো নিঃস্ব হয়ে গেছে। যাদের একদা ছিল  গোয়াল ভরা গরু আর শস্যে ভরা গোলা এবং পুকুর ভরা মাছ তারাই এখন নদী ভাঙ্গনের শিকার হয়ে আশ্রয় নিয়েছে ঢাকা, বরিশাল, চট্টগ্রাম বা যশোহর শহরের কোন বস্তিতে। কেউ রিক্সা চালায় আবার কেউ ঠেলা গাড়ি ঠেলে হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রমে পরিবার পরিজন নিয়ে দু- বেলা দু- মুঠো খাবার খেয়ে বেচে আছেন। হয়তো রিক্সা চালানোর ফাকে যশোহর শহরের খেজুর গাছের নীচে দাড়িয়ে বিশ্রাম নেওয়ার সময় ছোটবেলার বটবৃক্ষ আর হারিয়ে যাওয়া বাড়ি ঘরের দৃশ্য মনে পরে। স্মৃতি চারনের ফাকে বুক থেকে বেড়িয়ে আসে দীর্ঘ নি:স্বাস । হায়রে নিয়তি কোথা থেকে কোথায় নিয়ে এসেছে অভাগা মানুষগুলোকে। একের পর এক প্রাকৃতিক দূর্যোগের সাথে লড়াই করা মানুষগুলোর প্রধান পেশা কৃষি। সেই কৃষি জমি অনুর্বর হয়ে উঠেছে। আগের মত ফসল ফলে না। তাই ক্ষুধার জ্বালায়  মানুষ ব্যকুল হয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে পাড়ি জমিয়েছে। যারা পেশা হিসাবে বেছে নিয়েছে বঙ্গোপসাগর বা মেঘনায় ইলিশ শিকার তাদের  জীবনের কক্ষ পথও যেন বদলায়না। 

এ অঞ্চলের মানুষের মাঝে যে হৃদয়ের ঐতিহ্যের সর্ম্পক যেন সিডর, আইলা ও মহসেন এর আঘাতে হারিয়েছে। কথায় আছে ঘরে ভাত না থাকলে প্রেম জানালা দিয়ে পালায়। তেমনি যেন মহাসেন এর আঘাতে বনলতা সেন এর জলভরা চোখ আর পুরনো সম্পর্কের মূল্য দিতে পারছেন না। মহাসেন কে নাটোরের বনলতা বিদায় দিলো চোখের জলে। বনলতা সেন এর মত  যারা গ্রাম ছেড়ে শহরে এসেছেন তাদের মধ্যে হয়তো কারো কারো জীবনে এসে লেগেছে আধুনিকতার ছোয়া। যারা পৈত্রিক জমি জায়গার আশায় এখনো গ্রামে পরে আছেন তাদের  এখন জমির কৃষি কাজ করানোর জন্য টাকার বিনিময়ে দিনমজুর খাটাতে হয় অথবা চুক্তি দিয়ে কৃষি কাজ করতে হয়। হয়তো তারা মনে মনে ভাবেন এ ভাবে আর কত কাল ও দয়াল/ এ ভাবে আর কাটবে কত কাল? নাকি মানুষের সৃষ্টি এ প্রাকৃতিক দূর্যোগের ক্ষতিপূরন আদায় করে এ অঞ্চলের মানুষের দু:খ দুর্দশা ঘুচাবার জন্য সরকার এগিয়ে আসবেন? অতীত ঐতিহ্য হয়তো আর কখনো ফিরবে না কিন্ত দখিন উপকূলের মানুষ দু’ বেলা দু’ মুঠো ভাত খেয়ে পরিবার- পরিজন নিয়ে বেচে থাকতে পারবেন। পদ্মা সেতু নির্মানে ব্যর্থ সরকার এ অঞ্চলে মানুষের প্রত্যাশিত বিশ্বাসের হাট সেতুটি পর্যন্ত নির্মান করতে পারেননি। তবে মানুষের খাবারের নিশ্চয়তাটুকু দিতে মহাসেন , আইলা, সিডর মোকাবেলা করে যাতে লড়াই করে বাচতে পারেন সে ব্যবস্থাটুকু করবেন বলে আমরা আশা করছি। আমরা আশা করছি আর যেন কোন মহাসেন নতুন করে নাটোরের বনলতা সেন এর চোখ থেকে অশ্র“ না ঝড়ায়।

ফেইসবুকে আমরা

পুরনো সংখ্যা

নভেম্বর ২০১৮
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« অক্টোবর    
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০