September 26, 2018

যে কারনে হেরে গেলেন হিরন

--- ১৭ জুন, ২০১৩

খোকন আহম্মেদ হীরা ॥ বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে নিজের জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আত্মবিশ্বাসী থাকা সদ্য বিদায়ী মেয়র শওকত হোসেন হিরনের পরাজয়ের কারণগুলো অনুসন্ধান করে পাওয়া গেছে নিজ দলের কর্মীদের মূল্যায়ন না করা, বিএম কলেজের অধ্যক্ষকে মারধর, ভোটারদের চাপা ক্ষোভ, দলের ভিতরে বিদ্রোহী প্রার্থী, পাঁচ বছরে বিপুল সম্পত্তির মালিক হওয়াসহ বিভিন্ন ইস্যু। এছাড়া জনগণের মধ্যে সরকারের নেতিবাচক ইমেজ, পদ্মাসেতু দুর্নীতি, হেফাজতে ইসলাম ইস্যুও যুক্ত হয়েছে এসবের সঙ্গে। একই সঙ্গে ভোটের দিনে ভোট কেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর এজেন্টকে মারধর, বের করে দেওয়া, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী কামাল ও সাবেক এমপি আবুল হোসেনকে ঘুষি মারাও ভোটারদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে। এছাড়া বরিশালে উন্নয়নমুলক কাজের দিকে তাকিয়ে হিরনের রুচিশীলতার প্রশংসা করেছেন দলমত নির্বিশেষে সকলে। কিন্তু হিরণের বিশাল ব্যবধানে এ পরাজয়ের পর নেপথ্যের কারনগুলো নিয়ে নগরীতে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ ও আলোচনা।

দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জন ও শ্রেষ্ঠ করদাতার পুরষ্কার অর্জন ঃ ক্ষমতার পাঁচ বছরে হিরন অনেকটা জাদুর কাঠির ছোয়ায় নিজের সম্পদের বৃদ্ধি ঘটিয়েছেন। ২০০৮ সালে মেয়র পদে নির্বাচিত হওয়ার সময় দাখিল করা হলফনামায় হিরন উল্লেখ করেছিলেন স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি মিলিয়ে তার মোট সম্পদ ছিল মাত্র ১৭ লাখ ৫৭ হাজার টাকার ও বার্ষিক আয় ছিল ৬ লাখ ১২ হাজার টাকা। আর ২০১৩ সালে দাখিল করা হলফনামায় হিরন উল্লেখ করেছেন তার মোট সম্পদ প্রায় ১০ কোটি টাকা ও বার্ষিক আয় সাড়ে তিন কোটি টাকা। ২০০৮ সালে তিনি বার্ষিক মাত্র ৬ হাজার টাকা কর দিলেও ২০১২ সালে তিনি বার্ষিক ৮৭ লাখ টাকা কর দিয়ে বরিশাল বিভাগের শ্রেষ্ঠ করাদাতা হয়েছিলেন। যা ছিল তার চার বছর আগের মোট সম্পত্তিরও পাঁচ গুণ বেশি। আর ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় প্রজেক্টের টাকা হাতিয়ে হিরন এই সম্পদের পাহাড় গড়েছেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। আর নির্বাচনের দিনগুলোতে এ বিষয়টি ছিল বরিশালের একজন রিকশাচালক থেকে শুরু করে হোটেলের ছোট্ট চায়ের দোকানের সর্বকনিষ্ঠ কর্মচারীদের মুখে মুখে। এ বিষয়টি ভোটদানে প্রভাব রেখেছে দাবি কর্মীদের।

উন্নয়ন কর্মকান্ডে স্বচ্ছতার অভাব ঃ হিরন তার ক্ষমতার পাঁচ বছরে বরিশালে অনেক দৃশ্যমান উন্নয়ন করেছেন এটা যেমন সত্যি, তেমনি সত্যি এসব উন্নয়ন প্রকল্পে দূর্ণীতি ও লুটপাটের খবরও। রাস্তা সম্প্রসারন ও ডিভাইডার তৈরি করা হলেও রাস্তা টেকসই না হওয়ায় একই রাস্তার কাজ বছরের মধ্যে চার-পাঁচ বার করাতে হয়েছে। আর এসকল কাজ করানো হয়েছে নিজ ভাই ও স্বজনদের দিয়ে। নর্দমা নির্মানের ক্ষেত্রে নিচের ঢালাই যথাযথভাবে না দেয়ায় তা উঠে মাটি জমে নর্দমা আটকে থাকার ঘটনাও ঘটেছে হরহামেশা। এছাড়া রাস্তায় কোটি টাকা খরচে সড়কবাতি লাগানো নিয়েও অনিয়ম হয়েছে। একই রাস্তায় পাঁচ বছরের গ্যারান্টি থাকা সড়কবাতি খুলে সেখানে কিছুদিন পরপরই আবারো নতুন সড়কবাতি বসিয়ে বেশ কয়েকবার প্রকল্পের টাকা আত্মসাত করা হয়েছে। এসকল ঘটনা মিডিয়াতে তেমনভাবে প্রচার না হলেও নগরীর স্থানীয়দের মাঝে সবসময়ই আলোচনায় ছিল। আর তার স্বজনদের দিয়ে কাজ করানো এ সকল উন্নয়ন প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিশ্চত করতে না পারায় তার প্রভাব পড়েছে ভোটেও।

অবৈধভাবে অস্থায়ী কর্মপরিষদ ও ছাত্র কল্যাণ পরিষদ গঠন ঃ শওকত হোসেন হিরন বরিশালের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তার প্রভাব বিস্তার করতে বেছে নেন এক অভিনব পদ্ধতি। তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ছাত্রসংসদের আদলে নিজ অনুসারী ছাত্রলীগ কর্মীদের নিয়ে গঠন করেন অস্থায়ী কর্মপরিষদ ও ছাত্র কল্যাণ পরিষদ। এবং প্রভাব খাটিয়ে অস্থায়ী কর্মপরিষদ ও ছাত্র কল্যাণ পরিষদকে সেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রসংসদের ফান্ড ব্যবহারের অনুমতি আদায় করে দেন। আর এসুযোগে ছাত্রসংসদের ফান্ডের টাকা আত্মসাত করে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। হিরন বিএম কলেজ ছাত্রসংসদের আদলে গঠন করেছিলেন অস্থায়ী কর্মপরিষদ ও শেবাচিমে গঠন করেছিলেন ছাত্র কল্যাণ পরিষদ। এ দুটি কমিটির পদধারীরা ছাত্রসংসদের টাকা লুটপাটসহ ক্যাম্পাস ও ক্যাম্পাসের বাইরে বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়েন। তাদের এসব কর্মকাণ্ডে তরুন ভোটার ও ছাত্রদের মাঝে হিরনের ইমেজ ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।

বিএম কলেজের অধ্যক্ষকে মারধর ঃ বরিশালের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্রজমোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের (বিএম কলেজ) অধ্যক্ষ শংকর দত্তকে রাস্তার মাঝে মারধর করে হিরনের গঠিত অস্থায়ী কর্মপরিষদের নেতাকর্মীরা। কলেজের ছাত্র সংসদ ফান্ডের টাকা আত্মসাত বিষয়টি তদন্তে বের হয়ে আসলে হিরনের আজ্ঞাবহ অধ্যক্ষ ননী গোপালকে বদলি করে শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি শংকর দত্তকে নিয়োগের আদেশ হয়। তখন ছাত্রলীগ নেতারা শংকর দত্তকে মারধর করে যোগদান না করার জন্য। এ ঘটনায় নিরপরাধীদের ফাঁসিয়ে দেন হিরন। অনেকের বদ্ধমুল ধারণা হিরনের নির্দেশেই অধ্যক্ষকে মারধর করা হয়েছিল। অধ্যক্ষকে মারধরের বিষয়টি তরুন ভোটার ও ছাত্রদের মনে গভীর দাগ কাটে। আর বিএনপি তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় এ বিষয়টিকে সফলভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছিল।

স্থানীয় ভোটারদের চাপা ক্ষোভ ঃ রাস্তা সম্প্রসারন করার সময় দু’পাশের জমি অধিগ্রহন করতে হয়েছে হিরনকে। এজন্য সিটি কর্পোরেশন থেকে কোন ক্ষতিপূরনের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। অনেকের বাড়ির দেয়াল ভাঙ্গা হয়েছে, ভাঙ্গতে হয়েছে কারো কারো বাড়ির অংশও। এক্ষেত্রে তিনি তার আপন ফুপুর বাড়ি ভেঙে নগরীতে স্থাপনা ভাঙার উদ্বোধন করেছিলেন। সেসময় তিনি এজন্য সাধুবাদ পেলেও তা ধরে রাখতে পারেননি তার সহচারীদের কর্মকাণ্ডে। জমি অধিগ্রহনের সময় জমির মালিকরা কিছু ক্ষেত্রে আপত্তি করলে তাদের হুমকি-ধামকি দিয়ে জমি দিতে বাধ্য করে তার অনেক সহচারী। আর জমি ছাড়তে হওয়া এসকল জমির মালিকরা সকলেই নগরীর স্থানীয়। নিজ জমি হারানোর সাথে খারাপ ব্যবহার পাওয়ায় তারা ও তাদের স্বজনরা হিরনের ওপর ক্ষুদ্ধ ছিলেন। আর এর প্রভাব পড়েছে ভোটের ক্ষেত্রেও।

দলীয় কর্মীদের অবমূল্যায়ন ঃ আ’লীগের যেসব ত্যাগী নেতা-কর্মী ছিল তাদেরকে কোনই মূল্যায়ন করেননি হিরন। অন্যান্য দলের নেতাকর্মীদের সাথে হিরনের সদ্ভাব থাকলেও তিনি আ’লীগের ত্যাগী নেতাকর্মীদের অবহেলা ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে নাজেহাল করেছেন। দল ক্ষমতায় থাকলেও তারা ছিলেন মূলত বিরোধী দলে। নিজ প্রভাব ও বলয় তৈরির জন্য তিনি বিভিন্ন দল থেকে আগতদের আ’লীগের বিভিন্ন পদে বসান ও তাদের দিয়েই সব কাজকর্ম করিয়েছেন। বরিশালে পুরো সময় জুড়েই টেন্ডারাবাজি হয়েছে। তার ভাই মামুন, দিপু, অরুন ছিল এসব কাজ ভাগ-বাটেয়ারার দায়িত্বে। ‘গুছ’ হওয়া প্রতিটি কাজ থেকে দশ পার্সেন্ট করে আদায় করে তারা হিরনকে দিতেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। ক্ষমতার পাঁচ বছরে তার ও তার অনুসারীদের ভাগ্য আমুল পরিবর্তন হলেও বঞ্চিত থেকেছেন আ’লীগের একনিষ্ঠ নেতাকর্মীরা। সিটি কর্পোরেশনে বিভিন্ন পদে চাকরির ক্ষেত্রে অবমূল্যায়িত হয়েছেন এসব কর্মীরা। যে কারণে তারা দলের নির্দেশে নির্বাচনী মাঠে নামলেও মন থেকে হিরনকে সমর্থন করতে পারেননি। আর এ অভিমানের প্রভাব পড়েছে এসকল বঞ্চিত নেতাকর্মীর পরিবার ও স্বজনদের ভোটেও।

আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ’র সাথে টক্করের চেষ্টা ঃ বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ হিরনকে আ’লীগের রাজনীতিতে আনলেও তার সাথেই টক্কর দেয়ার চেষ্টা করেছেন হিরন। হাসনাত আব্দুল্লাহ’র সাথে উপরে সদ্ভাব ও নিজের গুরু বলে প্রচার করলেও বিভিন্নভাবে হেনস্থা করেছেন হাসনাতের কর্মী-সমর্থকদের। গত পাঁচ বছরে বিরোধীদলীয় কোন কর্মীর বাসাবাড়িতে হামলা না হলেও হামলা হয়েছে হাসনাত সমর্থকদের বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। বিভিন্ন প্রলোভন ও পরিস্থিতির সৃষ্টি করে হাসনাতের কিছু কর্মী-সমর্থককেও নিজ বলয়ে টানতে সক্ষম হন হিরন। নিজের বলয় বাড়িয়ে হাসনাতকে কোণঠাসা করতে সব সময়েই তৎপর ছিলেন হিরন। এবার কেন্দ্রের নির্দেশে হাসনাত প্রকাশ্যে হিরনের পক্ষে নির্বাচনের প্রচারণায় নামলেও তার কর্মী-সমর্থকরা বিষয়টি মন থেকে পুরোপুরি সমর্থন করতে পারেননি।

বহিরাগতদের নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা ঃ নির্বাচনের প্রচারণায় হিরনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যাদের দেখা গেছে, তাদের অনেকেই সিটি করপোরেশনের ভোটার ছিলেন না। তার সঙ্গে ছিলেন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আফজালুল করিম। তিনি হিজলা উপজেলার ভোটার। বিএম কলেজের সাবেক জিএস নাহিদ সেরনিয়াবাত আগৈলঝাড়ার বাসিন্দা। এরকম আরও অনেকে ছিলেন যারা বরিশাল সিটির বাসিন্দা নয়। আর তাদের দিয়েই মুল নির্বাচনী কাজকর্ম তদারকি করিয়েছেন হিরন। বহিরাগতরা প্রচারণা চালালেও নগরবাসীদের সাথে তাদের জানাপরিচয় না থাকায় তারা ভোটারদের গভীরে পৌছাতে পারেননি।

নির্বাচনের আগমুহুর্তে কামাল সমর্থককে পুলিশের গুলি ঃ নির্বাচনের মাত্র দু’দিন আগে ১২ জুন পাঁচ নারী কর্মীকে আটক হওয়া থেকে রক্ষা করতে গিয়ে প্রসাশনের কঠোরতার মুখোমুখি হন সদ্য বিজয়ী মেয়র (মেয়রপ্রার্থী) কামাল ও তার সমর্থকরা। সেদিন পুলিশ পাঁচ নারীকে আটকের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নিয়ে তাদের ছাড়িয়ে নিতে আসা প্রার্থী কামাল ও তার সমর্থকদের ওপর গুলি ছোড়েন। এতে আহত হন কামালের এক সমর্থক। নগরবাসীর অনেকের ধারণা, হিরনের নিদের্শেই সেদিন তার অনুগত ওসি শাখাওয়াত এত কঠোর ভূমিকা নিয়েছিল। ভোটের মাত্র দু’দিন আগে বিরোধীদের প্রতি প্রসাশনের এ কঠোরতাও সিটি নির্বাচনকে রাজনৈতিকভাবে দেখার জন্য ভোটারদের প্রভাবিত করেছে।

ভোটের দিনে বিতর্কিত কর্মকান্ড ঃ এদিকে ভোটের দিনে হিরনের বেশ কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ফলাও করে প্রচারিত হয় মিডিয়ায়। এদিন তিনি তার পতœী যেসকল কেন্দ্রে গেছেন, তার প্রায় সকল কেন্দ্রেই অঘটন ঘটেছে। সকাল সাড়ে ১১টায় নগরীর সাগরদী আলীয়া মাদ্রাসা ভোটকেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর পোলিং এজেন্টকে মারধর করে নিজ হাতে বের করে দেন তিনি। এরপর তার পতœী কাউনিয়া বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্র পরিদর্শনে যান এবং সেখানেও প্রতিপক্ষের ওপর হামলা করে ছাত্রলীগ। এরপর দুপুর একটার দিকে রূপাতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও তার অন্যতম নির্বাচন পরিচালনাকারী সাবেক সাংসদ আবুল হোসেনকে রক্তাক্ত করা হয়। এ দু’নেতাকে নিজ হাতে হিরন মারধর করেছেন বলে নগরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এসকল ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করে ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া। আর এ অপ্রীতিকর ঘটনাগুলো ভোটারদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে।

ফেইসবুকে আমরা

পুরনো সংখ্যা

সেপ্টেম্বর ২০১৮
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« আগষ্ট    
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০