September 15, 2019

রমজান আলীর ভাগ্যবিড়ম্বনা

--- ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৬

মাসুদ আমিন

মানুষের জীবন কতোই না অদ্ভুত। কখনই একই সরলরেখায় চলতে চায়না। একটু সুযোগ পেলেই নানা অলিগলিতে ঢুকে যেতে চায় যদি ষ্টিয়ারিং ঠিকমতো ধরা না থাকে। আমাদের রমজান আলীর জীবনগাড়ীও তেমনি। কখনই হাইওয়েতে মসৃনভাবে চলেনি। রমজান আলীর জীবন যেমন বৈচিত্র্যময় তেমনি বেদনাময়। মাঝে মাঝে রমজান আলী একাকী হলে বা ভাবের জগতে প্রবেশ করলে তার অতীতের নানা কাহিনী মনে পরে আর তিনি এলোমেলো হয়ে যান কখনওবা সরাবের দুনিয়ায় তলিয়ে যান। হয়না তাতে কোনো কাজ হয়না। তিনি কিছুতেই ভুলতে পারেন না। কি জীবন তিনি পিছনে ফেলে এসেছেন। কখনও শখের বশে কখনও জীবিকার প্রয়োজনে তিনি নানা কাজে নানা দেশে নিজেকে নিয়ে গেছেন। কখনও তিনি সফল হয়েছেন কখনও ব্যর্থতার মালা গলায় নিয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরে এসেছেন। কিন্তু কখনও হতাশ হননি। আল্লাহ ভক্ত হিসেবে নিজেকে তাঁর ছায়াতলে রেখেছেন সবসময়। তাঁর করুনায় তিনি হজ্ব পালনের তওফিক অর্জন করেছেন। আল্লাহর পবিত্র ঘরে রাত্রি শয়ন করেছেন। সাক্ষাত পেয়েছেন ফেরেশতার। একরাতে এশার নামাজ পরে তিনি কাবা ঘরেই শুয়ে পরেন। ফজরের কাছাকাছি সময় কেন কে যানে তার ঘুম ভেংগে যায়। দেখেন একজন উচু মানুষ সফেদ পোষাকে কাবা শরীফ তওয়াফ করছেন। গায়ের রঙ গোলাপী। মনে হয় গা থেকে আলো ছটকাচ্ছে। হঠাত রমজান আলী দেখেন তার পায়ে মখমল জাতীয় পাদুকা। কেমন ভেসে ভেসে চলেছেন। তিনি জানেন এখানে খালি পায়ে প্রবেশ করতে হয়। আধো ঘুমে অাধো জাগরনে তিনি উঠে তার পিছনে পিছনে ঘুরতে লাগলেন। হঠাত খেয়াল হতে দেখেন তিঁনি নাই। তার ঘোর কেটে যায়। ফজরের নামাজ পরে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন রমজান আলী। কতো কথাই মনে আসছে রমজান আলীর । মনে পরে সৌদী মেয়েদের কথা। যেমন ফিগার তেমনি গায়ের রঙ। ওদের দেখতে দেখতে তিনি আকুল হন ব্যাকুল হন। কিন্তু ছুতে পারেন না গর্দানের ভয়ে। কিন্তু ভরা বয়সে কতো আর দেখা যায় ! ভোগও তো লাগে। শুনুন সেই বেদনার কাব্য। বেদনার রঙ হয় নীল। রমজান আলীর হয়েছে বহু বর্ণিল। দেশে এসে দেখেন কলেজ জীবনের বান্ধবী ছন্দ হারিয়ে উড়ে গেছে এ্যামেরিকা। তিনি ক্ষুব্ধ হন নিঃস্ব হন। তিনি গিয়েছিলেন মাহাছিব আকামায়। বছর দুয়েক পর সৌদী সরকার ফরমান দিলো শুধু সৌদীরাই হতে পারবে ক্যাশিয়ার। তিনি চাকরীচ্যুত হন। এখানে ওখানে ঢু মারেন কিন্তু করার কিছু নাই। শেষমেষ বন্ধু বাবুর সহায়তায় সিগারেট চালান দিতে লাগলেন মাইক্রোতে করে দুরদুরান্তে। কিন্তু তাও বিধাতার সইলো না। সৌদী পুলিশ একদিন হাতে নাতে হাইওয়েতে বমাল ধরে ফেললো। অনেক কথা চালাচালির পর আকামা দেখিয়ে রেহাই মিললো। কিন্তু ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলো। বলা হয়নি রমজান আলী চাকুরী হারানোর পর কার উপর কে জানে গোস্বা হয়ে দাড়ি রেখেছিলেন। ছাগলা টাইপের। তবে চেহারায় কিছুটা সৌদী হুজুর টাইপ ছাপ এসে গিয়েছিলো। সেই বলে তিনি মসজিদের ইমামতি প্রাপ্ত হন একটি বহুজাতিক কোম্পানীতে। নামাজ পড়ান আর জিকির করেন রুটি রুজির নাকি পত্নীর তিনিই জানেন। একদিন মসজিদে পরিচয় হলো এক পাকিস্তানীর সাথে,নাম ওমর। কথায় কথায় তিনি হুজুরকে তার দুঃখের কথা বয়ান করলেন। দেশে তার পত্নী সন্তান সম্ভাবা। সময় আছে মাস কয়েক। কিন্তু কি এক জটিলতায় তার প্রান যায় যায় অবস্থা। তাকে দেশে যেতেই হবে। রমজান আলী বুঝতে পারেন নাই তার জীবনের স্বর্ণসময় এসে ধরা দিতে চাইছে। বিধাতা মুচকি মুচকি হাসছেন। তিনি দেখছেন রমজান আলী সুযোগটা কাজে লাগাতে পারেন কিনা? সুইস পারফিউম কোম্পানি ওমরকে শর্ত দিয়েছে একজন যোগ্য লোককে তার স্থানে দিয়ে যেতে হবে। যাকে তাকে তো সুপারশপের দায়িত্ব দেয়া যায় না। তিনি অনেককে নিয়ে গেছেন কিন্তু তারা কাউকে পছন্দ করতে পারছেন না। শেষমেষ তিনি বাধ্য হয়ে আর কাউকে না পেয়ে রমজান আলীর শরনাপন্ন হয়েছেন। তিনি যদি তার সাথে গিয়ে ইন্টারভিউ দিয়ে পাশ করেন তাহলে তার গতি হয়। রমজান আলী রাজী হন। তিনি সাত দিন নানাবিধ পারফিউম ও সোপের নাম মুখস্ত করেন ও কোনটা কোন স্কীনে কাজ করে তা ডোশিয়ে দেখে মুখস্থ করেন। আবার কোনটা কোন সারিতে আছে তাও মোটামুটি আয়ত্ত করেন। এরপর সুপার শপের মালিক সৌদী যুবরাজ শপে আসেন সাক্ষাতকার নিতে। জিজ্ঞাসা করেন, ” আমার ত্বকের জন্য কোন সাবানটা ভালো হবে? ” রমজান আলী তখনও জানেন না উনি যুবরাজ। তিনি তাঁর স্কীন স্পর্শ করেন এবং একটা সারি থেকে একটা সাবান এনে বলেন আপনার জন্য এটা পারফেক্ট হবে। ভদ্রলোক বলেন, গুড এটাই আমি ব্যবহার করি। তুমি কাল আমার অফিসে দেখা করো, বলে চলে যান। পাকিস্তানী ওমর খুশীতে রমজান আলীকে জড়িয়ে ধরেন। তাকে কেএফসিতে নিয়ে দামী ডিশ দিয়ে অাপ্যায়ন করেন। পরদিন তাকে নিয়ে যুবরাজের অফিসে যান এবং যাবার পথে বলেন তুমি দশ হাজার রিয়াল বেতন চাইবে। আমি বারো হাজার পাই। শুনে রমজান আলীর পা কাঁপতে থাকে। ব্যাটা বলে কি! আমি তিন হাজার রিয়ালে ইমামতি করি আর আমাকে কিনা দশ হাজার চাইতে বলে ! অফিসে যাবার পর আরেক তেলেসমাতি। তিনি ঢোকার পথে দেখেন কাঁচের ফ্লোর। নীচে রঙিন মাছেরা সাতার কাটছে। তার উপর দিয়ে হেটে অফিসে ঢুকতে হয় ! সামনে রিসেপশনে হুর পরী বসা। রমজান আলীর বুক ঢিবঢিব করতে থাকে। এ আমি কোথায় এলাম। তখনও তিনি জানেন না, এটা একজন যুবরাজের অফিস। তাহলে হয়তো ভয়েই আসতেন না। যাক, যুবরাজ যখন জানতে চাইলেন তুমি তিনমাস এর বদলে কাজ করবে তখন রমজান আলী বললেন হ্যা করবো। জানতে চাইলেন তুমি কতো করে চাও। তিনি ভয়ে ভয়ে বললেন পাঁচ হাজার। তখন আড়চোখে দেখলেন ওমর জিবে কামড় দিয়েছে। যাক চাকরী হয়ে গেলো। ওমর পরদিনই দেশে চলে গেলেন। তিন মাসে রমজান আলী ব্যবসা দ্বিগুন করে ফেললেন। ওমরের মতো সৌদী মেয়েদের সাথে ফালতু আড্ডা দিয়ে সময় নষ্ট করতেন না। কাষ্টোমারদের যথেষ্ট সময় দিতেন। তবে মাঝে মাঝে সৌদী মেয়েদের তিনি মাসাল্লা হালুয়া হালুয়া বলার লোভ সামলাতে পারতেন না। অপরুপ সুন্দরী শুনে মেয়েগুলো ভালো টিপস দিতো। কিন্তু মেয়েগুলো এতো ধেড়ে পাকা যে কেউ বলতো না লেটস গো ছোগল দুগদুগ। যাক সেকথা, যুবরাজ এতো খুশী হলেন যে একদিন শপে এসে রমজান আলীকে নিয়ে ফাইভ ষ্টার হোটেলে ডিনার করালেন। ওমর ফিরে আসার পর অন্যান্য ষ্টাফদের কাছে ঘটনা শুনে থ। ভাবলেন আমি আর নাই। রমজান আলী বললেন, ওমর ঘাবড়াও মাত। যুবরাজের অফিসে যাওয়ার পর তিনি জানতে চাইলেন রমজান আলী এখন তুমি কি করবে? রমজান আলী বললেন, আমার আকামায় মাহাছিব লেখা। আমাকে বাংলাদেশে ফিরে যেতে হবে। কারন আমি অন্য চাকরী পাবো না। শুনে যুবরাজ হতভম্ব হয়ে গেলেন। বললেন, কি তুমি বাংলাদেশী ! ওমর তুমি পাকিস্তানি হয়ে কি করে অন্য দেশের একজনকে বিশ্বাস করলে ? ও যদি ক্যাশ নিয়ে চলে যেতো ?আমি তো ভেবেছিলাম তোমার দেশী বিশ্বস্ত লোক। ওমর কাচুমাচু হয়ে বললেন, স্যার আমার উপায় ছিলনা। আমার বউ তখন যায় যায় অবস্থা। যুবরাজ রাগত স্বরে বললেন, তুমি যদি বহু পুরনো লোক না হতে তাহলে তোমাকে আজই ছাটাই করতাম। তুমি সেলসে মন দাও। এই ছেলেটা এ’কদিনে সেল কোথায় নিয়ে গেছে খাতা চেক করে দেখো। আর শোনো রমজান আলী, আমি যুবরাজ তোমার আকামায় যাই থাক, তোমার অসুবিধা নাই। তুমি আরেকটা আউটলেটের চার্জ নাও। তোমাকে বারো হাজার রিয়াল, সাথে থাকার ফ্ল্যাট ও কোম্পানির গাড়ী দেয়া হলো। আর টার্গেট ক্রস করলে বোনাস।রমজান আলী থেকে গেলেন। সারাদিন পরিশ্রম করেন, রাতে দেশে ঘন্টার পর ঘন্টা প্রিয়ার সাথে সুখের কথা বলেন। হঠাত করে প্রিয়ার মোবাইল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিনি অস্থির হন, শংকিত হন। উপায়ান্তর না পেয়ে যুবরাজকে বাবার অসুখের কথা বলে দেশে চলে আসেন । এসে শোনেন প্রিয়া উড়ে গেছে অন্যের বধূ হয়ে পরদেশ। তিনি গঞ্জিকা বাবা থেকে হেন বাবা নাই যাতে ডুবে যেতে লাগলেন না । যুবরাজ দিনের পর দিন ফেরার তাগাদা দেন, সৌদী ডালিম বিয়ে করানোর লোভ দেখান। কিন্তু কিসে কি রমজান আলী ভাবের জগতেই ডুবে যেতে লাগলেন । আজ দীর্ঘদিন পর রমজান আলীর মনে হচ্ছে জীবনের একটা বিশাল সময় স্বর্ণালী সময় তিনি কতো তুচ্ছ কারনেই না হেলায় হারিয়েছেন।

ফেইসবুকে আমরা