September 23, 2018

শিক্ষা গুরু না হইয়া কনস্টেবল হইলে ভালো করিতেন

--- ২০ এপ্রিল, ২০১৩

লিটন বাশার ॥ যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবী ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবীতে যখন দেশ দ্বিধা বিভক্ত হইয়া দুই মেরুতে দাড়াইয়াছে তখনই দক্ষিন বাংলার শ্রেষ্ট বিদ্যাপিঠ বিএম কলেজের অধ্যক্ষ’র উপর যে বর্বর হামলার সচিত্র প্রবিদেন ও বর্ণনা শুনলাম তা সত্যিই দু:খজনক। বিএম কলেজের ইতিহাসের এ জঘন্যতম অধ্যায়টি যেদিন সৃষ্ঠি হইয়া ছিল সেই দিন বরিশালে ছিলাম না। তাই সহকর্মীদের মত দু:খজনক ঘটনাটি নিজের চোখে দেখিতে হয় নাই। ব্যক্তিগত কাজে রাজধানী ঢাকার কারওয়ান বাজার ইত্তেফাক অফিস হইতে সিএনজি যোগে মতিঝিল রাজউক ভবনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করছিলাম। মিন্টো রোডের মধ্যে ঢুকতেই কয়েকজন সহ কর্মীর সেল ফোন হইতে কল আসিতে লাগলো। রুক্ষ রাজধানী ঢাকা শহরের বুকে সবুজের আর্দ্র টুকু হিসাবে কিছু বৃক্ষরাজী থাকায় মিন্টো রোডটি আমার প্রিয়। ব্রিটিশ বেনিয়াদের আমলে লর্ড মিন্টোর নামে গড়ে উঠা এ সড়কে অবশ্য এখনো পঞ্চ বার্ষিকীয় কিছু খারাপ লোকের আবাসস্থল হিসাবে পরিচিত । সবুজের বৃক্ষরাজী ছাড়া সেখানে লর্ড মিন্টোর রুচীর সৌন্দের্য্যরে আর কোন ঐতিহ্য নেই। ঐতিহ্যের শেরাটন হোটেলটি খোলস পাল্টাইয়া রুপসী বাংলা নাম হইয়াছে। তবুও অস্তিত্ব সংকটে এখন হোটেলটি। শুনেছি হোটেলের বিশাল জমির উপর লোলুপ দৃষ্ঠি পরেছে সরকারী দলের নেতারা। তাই হোটেলের জায়গা দখল করিবার উদ্দেশ্যে নানান ফন্দি ফিকির চলিতেছে।  কিন্ত মিন্টো রোডের আবেগ জড়ানো বৃক্ষরাজীর শিতল অনুভূতি টুকু গ্রহনের স্বাধ পেলাম না। আধুনিক যন্ত্রদানব মোবাইল ফোনটি বেজেই চলছে। সহকর্মীরা অনেকেই  উৎকন্ঠার সাথে জানাইলো যে  বিএম কলেজে যোগদান করিতে আসা অধ্যক্ষ  প্রফেসর শংকর চন্দ্র দত্তকে বেধরক ভাবে মারধর করেছে ছাত্রলীগ ক্যাডার বাহিনী।  
বিএম কলেজের ইতিহাসে দূর্ণীতির বরপুত্র হিসাবে পরিচিত অধ্যক্ষ ড. ননী গোপাল দাসকে রক্ষা করিতেই ছাত্রলীগের একটি গ্র“প টানা ১৪ দিন ক্যাম্পাস অচল করিয়া রাখিবার পর এই দু:খজনক ঘটনাটির জন্ম দিয়াছেন। অপ্রতিকর ঘটনার আশংকা আগেই গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হইয়াছিল। কিন্ত ছাত্রলীগের সোনার ছেলেদের কেহউ নিয়ন্ত্রন করিতে আগাইয়া আসিলেন না।
তাই যাহা হইবার তাহাই হইলো। যাহা ঘটিবার আশংকা করিয়াছিলাম আমরা তাহাই চোখে আঙ্গুল দিয়া সত্য বলিয়া প্রমান করিয়া দিলো আমাদের সোনার ছেলেরা।  বিএম কলেজের ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংসদকে পরিচালনার জন্য ছাত্রলীগের যে গ্র“পটি কর্ম পরিষদ নাম দিয়া হরিলুট চালাইতেছিল তাহারাই অপকর্মটির মুল হোতা বলিয়া পত্র-পত্রিকায় পরের দিন সচিত্র প্রতিবেদন হইতে জ্ঞাত হইলাম।
বরিশাল ফিরিয়া স্থানীয় দৈনিক গুলোর সচিত্র প্রতিবেদন দেখিয়া হতবাক হইলাম। হায়রে এ কোন দেশ! যেখানে বিদ্যান- পন্ডিত ব্যক্তিকে এ ভাবে সন্তানের চেয়ে ছোট বয়সী ছেলের হাতে প্রহার সহিতে হয় সেখানে কে কাকে জ্ঞান দান করিতে ছুটিবে!  সন্তানের চেয়ে কম বয়সী ছেলের প্রহার সহিতে না পারিয়া বৃদ্ধ বয়সে এক অসহায় এক পিতাকে সড়কে দৌড়াইতে দেখিলাম। হায়রে এই কি কবি নজরুলের প্রাচ্যের ভেনিস? এই কি জীবনান্দদ দাশের বরিশাল?  আর কতটা সামাজিক অবক্ষয় হইলে আমরা লজ্জিত হইবো ? তাহা হয়তো  চিন্তা করিলে কেহই আমার মত  ভাবিয়া কুল কিনারা করিতে পারিবেন না।
কবির কাদের নেওয়াজের ‘শিক্ষকের মর্যাদা’ নামক একটি বহুল পঠিত কবিতার কথা আমাদের সকলেরই জানা। এই কবিতাটি স্কুলে পাঠ্যও বটে। সেই কবিতায় বাদশা আলমগীরের ছেলে শিক্ষকদের পা ধৌত করিবার কাজে পানি ঢালিয়া সহযোগিতা করিতেছিল। বাদশাহ রাজ দরবারে শিক্ষককে তলব করিয়া তাহার সন্তান কেন ওস্তাদের পা নিজ হাতে ধৌত করিয়ে দেন নাই তাহার কৈফয়ত চাহিয়াছিলেন। সেখান হইতে ছাত্র- শিক্ষক সম্পর্ক আজ কোথায় নামিয়া গিয়াছে তাহা বিএম কলেজের ঘটনায় অনুমেয়। ঘটনার পরবর্তীতে শাসন যন্ত্রের দায়িত্ববোধ বা বিবেক জাগ্রত হইলো না। প্রকাশিত সংবাদ গুলোতে বলা হইয়াছে অধ্যক্ষ শংকর দত্ত তাহার নিরাপত্তা চাহিয়া কোতয়ালী মডেল থানায় একটি লিখিত আবেদন আগের রাতেই করিয়াছিলেন। পুলিশ তাহার নিরাপত্তা প্রদান তো দূরের কথা বর্বর এ ঘটনার পরও অভিযুক্তদের গ্রেফতার না করিয়া হাত পা গুটাইয়া বসিয়া আছেন। ৪ জনকে গ্রেফতার দেখানো হইলেও তাহাও নাকি নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি সিটি মেয়র শওকত হোসেন হিরন ধরিয়া থানায় সোর্পদ করিয়াছেন। পুলিশ বাদী হয়ে দায়েরকৃত  মামলায় ঐ ৪ জনকে আসামী দেখানো হইয়াছিল। গ্রেফতারকৃতরা মুল হামলাকারী অকর্ম পরিষদের নেতাদের ফুড ফরমাইশ খাটিয়া থাকা কর্মী বা কর্মচারী হিসাবেই ক্যাম্পাসে পরিচিত। তাই তাহাদেরও বেশী দিন জেল খাটিতে হয় নাই। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে তাহারা শিক্ষকদের প্রধান অধ্যক্ষকে পিটিয়া এখন ক্যাম্পাসে শিক্ষকদের সামানেই বুক উচু করিয়া ঘুরিতেছে। শিক্ষকরা তাহাদের দেখিলে লজ্জায় উল্টো মাথা নিচু করিয়া পথ চলেন। পুলিশ হামলা ঠেকানো বা হামলাকারীদের গ্রেফতার তো দূরের কথা ছাত্রলীগের চাকর – বাকর কেও ধরিতে সাহস পাইলো  না। তাই শংকর দত্ত’র মত নিরহ শিক্ষকরা আজ লজ্জার চেয়ে তাদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে বেশী উৎকন্ঠায় রহিয়াছেন। কারন এত বড় জ্ঞানী বা শিক্ষিত পন্ডিত না হইয়া যদি এসএসসি পাশ করিয়া একজন কনস্টেবল হিসাবে নিয়োগ পাইতেন তাহা বোধ করি ভাল হইতো । কারন অধ্যক্ষকে বেধরক রাস্তায় পিটাইয়া যে ভাবে উদ্ধৃত্ত দেখানো হইয়াছে তাহা যদি একজন কনস্টেবল এর উপর কেউ চর্চা করিতে যাইতো সে বুঝিতো কত ধানে কত চাউল। তাতে সে ছাত্রলীগ বা যুব লীগের যতবড় ক্ষমতাধর হোক না কেন।
 সারাদেশে জনশ্র“তি রহিয়াছে বর্তমান সরকারের সকল অর্জন ম্লান করিয়া দিয়াছে ছাত্রলীগ। শিক্ষা , শান্তি – প্রগতির শ্লোগান নিয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিজ হাতে গঠন করা ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রন হারাইয়া খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করিয়াছিলেন। কিন্ত শিক্ষা শান্তি প্রগতির শ্লোগানের ধারক ও বাহকরা বিন্দুমাত্র বিচলিত হইলো না। বরং তারা বিশ্বজিৎ হত্যাকান্ড থেকে বিএম কলেজ ক্যাম্পাস পর্যন্ত সন্ত্রাসে মাতিয়া উঠিয়াছে।
বর্তমান সরকার বা বর্তমান সিটি মেয়র শওকত হোসেন হিরন যাই বলা হউক না কেন বরিশাল নগরীতে এত উন্নয়ন আর কখনো হয় নাই। কিন্ত শেষ সময় কি তাহার সকল অর্জন ম্লান করিয়া দেওয়ার নীল কক্সা বাস্তবায়ন করিতে ছাত্রলীগের একটি অংশ বেপরোয়া হইয়া উঠিয়াছে তাহা অনুসন্ধান করিয়া দেখা প্রয়োজন বলিয়াই মনে হইয়াছে। বিষয়টি রাজনীতিতে ঘা খাওয়া নেতা যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের অনুধাবন করিয়াছেন হয়তো। তিনি বরিশাল সফর কালে সম্প্রতি হামলাকারী ছাত্রলীগ নেতাদের উপস্থিতিতেই এক সমাবেশে বলিয়াছেন যাহারা অধ্যক্ষকে প্রকাশ্যে রাস্তায পিটাইয়াছে তাহাদের মত ছাত্রলীগের কোন প্রয়োজন আওয়ামী লীগের মত রাজনৈতিক দলের নেই। তিনি হাইব্রিড আওয়ামী লীগ নেতাদের সমালোচনা করিয়া এ ধরনের সন্ত্রাসীদের দলে আশ্রয় – প্রশয় না দেওয়ার জন্য আহবান জানাইয়া ছিলেন। কিন্ত ওবায়দুল কাদের ফিরিয়া যাইবার দীর্ঘ দিন পরও পরিস্থিতির কোন রদবদল হয়নি। শাসকরা তাহাদের অবস্থান হইতে সরিয়া দাড়াইতে পারেন না। তাহা হইলে ভবিষ্যতে কি দৃষ্টান্ত লইয়া আমাদের চলিতে হইবে। তাহাও ভাবিয়া দেখিবার সময় আসিয়াছে।    
ফুলের প্রতি মানুষের পুস্প কাননে যাওয়ার মতই যিনি জ্ঞানের আলো ছড়াইবার জন্য শিক্ষকতার মত মহান পেশায়কে বাছিয়া লইয়াছেন। তাহা আকাশের চাদ হইয়া গিয়াছে। শিক্ষাগুরু তাই আজ হয়তো ধুলায় লুটোপুটি খাইতেছেন। আর আমরা যারা নিজেদের বিবেকবান হিসাবে দাবী করিতেছে তাহারাও যেন অহসায় নির্বাক হইয়া তামশা দেখিতেছি। আমাদের স্বাধীনতার স্বাধ ও স্বপ্ন কি অধোরাই থাকিয়া যাইবে।

ফেইসবুকে আমরা

পুরনো সংখ্যা

সেপ্টেম্বর ২০১৮
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« আগষ্ট    
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০