November 19, 2018

সাধু শয়তান…!

--- ২৯ জানুয়ারি, ২০১৫

লিটন বাশার ॥ গত ৫ ডিসেম্বর দেশের সর্বাধিক প্রচারিত ইংরেজী দৈনিক ডেইলি ষ্টারের একটি উপ-সম্পাদকীয় কলামের শিরোনাম ছিল ‘ক্ষমতার অহংকারই পতনের কারণ হতে পারে’। ইংরেজীতে আমি অনেক কাচা। তাই শিরোনামটির বাংলা শব্দার্থ এক পন্ডিতের কাছ থেকে নিশ্চিত হওয়ার পর অল্প বিদ্যায় যে ভয়ংকর বিষয়টা পড়লাম তাতে যা বুঝলাম রাজনীতি এবং রাজনৈতিকদের অবমাননাকর অবস্থা থেকে স্পষ্টতই বুঝা যায় আমাদের দেশে গণতন্ত্র বর্তমানে অকার্যকর। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর উপযুক্ততা এবং নূন্যতম সৌজন্যতাবোধ দেখে খুব সহজেই বোঝা যায় গণতন্ত্র কিভাবে লাঞ্ছিত হচ্ছে। যেহেতু লেখাটি গত বছর ডিসেম্বর মাসের ৫ তারিখের সেহেতু লেখকের চোখে বিএনপি চেয়ারপার্সনের বাড়ির সামনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আগমন ও নির্গমনের খবরটি হয়তো উদ্ধৃত করা সম্ভব হয়নি। একই ভাবে গত দু’ মাসে রাজনীতির বেহাল দশার অনেক চিত্রই হয়তো তখন উপস্থাপন করা হয়নি। তিনি নানান অঘটনের কথা তুলে ধরে অতি সংক্ষেপে আ.লীগ-বিএনপির সংঘাতময় রাজনীতির গত দু’ দশকের বর্ননায় কতিপয় নারী (নেত্রী) সদস্যের অল্লীল অকথ্য ভাষার ব্যবহার ও তাদের যোগ্যতা এবং দক্ষতার দিকে প্রশ্নবোধক ইশারা করেছেন। ইংরেজি ভাষায় লেখক যা লিখেছেন তার বাংলা বুঝতে আমি যদি ভুল না করে থাকি তাইলে তিনি লিখেছেন বিদেশি কূটনীতিকদের সাথে অপমানজনক ভাষার চর্চা স্বভাবতই মনে প্রশ্ন জাগায় । এটা কি আমাদের অজ্ঞতা, অপরিপক্কতা নয়, আমরা কি ভূল করছি না, এটা কি নিছক আমাদের অহংকার নয় ? এই ক্ষমতার অহংকারই পতনের কারণ হতে পারে।
বাংলাদেশ স্বাধীনতার কয়েক যুগ পার করে এসেছে অথচ এ দেশের কর্তা ব্যক্তিরা এখনো কূটনৈতিক আদব কায়দা শিখতে পারেনি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং এলজিআরডি মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফ মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা এবং নিশা দেশাই বিশওয়ালকে যে ভাষায় গালমন্দ করেছে তাকে লেখক আমাদের জন্য খুবই লজ্জাজনক বলে অভিহিত করেছেন। ডেইলি ষ্টারে লেখক যা ইংরেজী হরফে তুলে ধরলেন তাতে সৈয়দ আশরাফকে এই সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে তার দল আ. লীগ। জোর করে ক্ষমতায় এলে এরকমই হয়ে থাকে। তখন তাদের কোন হুশ থাকে না, বিকেব, বিবেচনাবোধ বলতে কিছু থাকে না। বিনয়ের সাথে কাউকে অনেক কটু কথা বলা যায় কিন্তু একজন কূটনীতিকে জনসমুক্ষে এভাবে গাল দেয়ার অধিকার অন্তত পক্ষে একটি দেশের মন্ত্রী কিংবা একজন রাজনীতিকের নেই। আমরা বিশ্বাস করি বাংলাদেশ অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভালো একটি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কিন্তু একজন সৈয়দ আশরাফ বা এলজিআরডি মন্ত্রীর বক্তব্য সে অবস্থান নিয়ে কোথায় দাড়া করালো।
সৈয়দ আশরাফ মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনাকে কাজের মেয়ে ‘মর্জিনা’ বলে কটুক্তি করে বলেন, মজিনা আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করতে চাইছে। সৈয়দ আশরাফের এ কথা শুনলে যে করোর মনেই সায় দিবে যে, এটা আসলে ইচ্ছাকৃতভাবেই বলেছেন। তার বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্ক জটিল করবে বলে সংকেত দিয়েছিলেন ডেইলি ষ্টার।
ডেইলি স্টারের সেই লেখার পর গত প্রায় দু’মাসে পদ্মা – মেঘনায় অনেক জল গড়িয়েছে। রাজনৈতিক সংকট আরো কয়েক গুন জটিল আকার ধারন করেছে। সংকট এতটাই প্রকট হয়েছে যে আন্তজার্তিক পর্যায়ে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে যারা খেলা ধুলা করেন তাদের মত দুয়েক জনের মুখে বানী মাঝে মধ্যে শোনার সৌভাগ্য হয় আমার। সেই রকম ব্যক্তিদের কন্ঠেও যেন আজ হতাশার সুর শুনতে পাই। তারাই উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলছেন শংকার রাজনীতির শেষ কোথায় তা বলা মুশকিল। সর্ব রোগের মহা ঔষধের মত যারা সব রাজনৈতিক জটিলতা – কুটিলতার পথ পরিস্কার করে জাতিকে সত্য সুন্দরের পথ দেখান তাদের কন্ঠে এ কথা বেনান হলেও ‘সত্য যে আজ রবীন্দ্রনাথের ভালবাসার মতই কঠিন’। এই কঠিন সত্য কথাটি আমরা সকলেই আজ অনুধাবন করতে পারছি।
অবচেতন মনের মাঝে আরো রেখাপাত করলো গতকাল দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত খ্যাতিমান সাংবাদিক আবেদ খানের লেখা একটি উপ-সম্পাদকীয় পাঠ করে। তার লেখার শিরোনামটি আমার খুবই প্রিয় একটি বাক্য – ‘ সবই কি চলে যাবে নষ্টদের অধিকারে’। অবশ্য লাইনটি চরম হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে খেদ ও ক্রোধের সঙ্গে লিখেছিলেন প্রয়াত প্রতিভাধর লেখক অধ্যাপক হুমায়ন আজাদ। জনাব আবেদ খান সেই মরহুম হুমায়ন আজাদের উদ্ধৃতি দিয়েই লিখেছেন বুদ্ধি, বিবেক, ন্যায়-নীতি -রুচী, শিষ্টাচার, সভ্যতা, ভদ্রতা, শিক্ষা-দীক্ষা কিছুই আর রইলো না আতœসম্মান বোধসম্পন্ন মানুষের জন্য। বর্তমান বাস্তবতায় আবেদ খানের এই লেখা যেন আমার মত ভদ্র ভাবে বেচে থাকার স্বপ্ন দেখা প্রতিটি মানুষের।
আবেদন খান তার দীর্ঘ লেখায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম স্থপতি ক্যাপ্টেন মুনসুর আলীর জ্যেষ্ট পুত্র সাবেক সংসদ সদস্য ডা. মোহম্মদ সেলিমের মৃত্যু এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কনিষ্ট পুত্র আরাফাত রহমান কোকোর একই সময় মৃত্যু এবং বিদেশী কুটনৈতিকদের অবস্থান নিয়ে শাসক দল আওয়ামী লীগের সমালোচনা করেছেন। হুমায়ন আজাদের মতই ক্রোধের সুরে আদেন খান বলেছেন বিএনপির রাজনৈতিক পরিপক্কতার কাছে আওয়ামী লীগ পরাস্ত হয়েছেন। শঠতার জয়যুক্ত হওয়ার কথা তিন বার উচ্চারন করে খুব দৃঢ়তার সাথে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আওয়ামী লীগের ব্যর্থতার কথা স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরেছেন। দু’ মাস আগে যে আভাস দিয়েছিল ডেইলি ষ্টার তার প্রমান যেন উপস্থাপন করলেন আবেদ খান। শাসক দলের সমস্যা হচ্ছে অতি উৎসাহী আওয়ামী লীগ নেতা-কর্র্মীরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অগ্রপথিক আবেদ খানের মত সচেতন মানুষের কথা কানে তুলতে চান না। প্রয়োজনে আবেদন খানদের বিএনপি- জামায়াত বানিয়ে দিতেও ছাড় দেন না। কিন্ত কথা হচ্ছে এতে কি শেষ রক্ষা হয়।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতার মসনদে তখন দৈনিক জনকন্ঠে নিয়মিত কলাম লিখতেন আবেদন খান। শিরোনাম ছিল ‘ সাধু সাবধান’। আবেদ খান তার লেখায় ঐ সময়ে আওয়ামী লীগের ভুল ত্রুটি স্মরন করিয়ে দিয়ে সাবধান হওয়ার পরামর্শ দিতেন। কিন্ত অতি উৎসাহী তৎকালিন শাসক দলের লোকজন তা কানে তোলেননি। যে কারনে মাঠ পর্যায়ে তৃণমূল কর্মীরা চরম এক অমানবিক আচরনের শিকার হলো ২০০১ সালের ১ অক্টোবর। আওয়ামী লীগের বিপর্যয়ের জন্য মাশুল দিতে হলো এ দেশের সংখ্যা লঘু সম্প্রদায়কে। আবেদন খানের তৎকালিন লেখায় বার বার আওয়ামী লীগের ভুল ত্রুটি চিহিৃত করে সর্তক হওয়ার পরামর্শ দেওয়ার কারনে বিএনপি’র লোকরা তখন বিদ্রুপ করে বলতো ‘ সাধু শয়তান’। আর পরাজয়ের পর এক বুদ্ধিজীবির মুখে শুনেছি আওয়ামী লীগ যদি শুধুমাত্র আবেদ খানের ‘সাধু সাবধান’ কলামটি পড়েও কিছুটা সংশোধন হতো তাইলে এই বিপর্যয় আজ নেমে আসতো না। তখন আফসোস হয়তো কোন কাজে লাগেনি। এবারও সব যদি চলে যায় নষ্টদের অধিকারে তারপর আফসোস করে কি কোন লাভ হবে। যদি আবারো বিপর্যয় নামে তাইলে কি এর দায়ভার গ্রহণ করবেন শাসকদলের ব্যর্থ নীতি নির্ধারকরা। নাকি তাও গড়াবে নীচের দিকে- তৃনমূলে। যেখানে খেটে খাওয়া মানুষের বাস সেখানেই কি আবার আমাদের কান্না শুনতে হবে। ক্ষমতার এই পালা বদলে যারা রাজনীতি বোঝেন না তাদের চোখেও যে লোনা জল ঝড়িয়ে যায়। রাজনৈতিক বক্তৃতা আর কুটকৌশলের মাঝে আর কত নিরহ মানুষের কান্নার শব্দ চাপা পড়ে যাবে এ বাংলায়।

ফেইসবুকে আমরা

পুরনো সংখ্যা

নভেম্বর ২০১৮
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« অক্টোবর    
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০