July 23, 2017

পেয়াজের ঝাঁজে গদি উল্টাইয়া যাইতে পারে

--- ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

makhonchoa_1337577784_1-Fresh_Onion_15131

লিটন বাশার ॥ আহা পিয়াজ! কাদালে তুমি মোরে, হাসালেও তুমি। তোমারে কিনিতে গিয়া, তোমারই ঝাজে এখন চোখ জ্বলে। তোমারই রঙ্গ কার্টুন বিষাদে হরষ আনে বটে—একখানি আংটির শীর্ষে হীরক পাথরের পরিবর্তে ছোট্ট একটু পিয়াজ তুমি আসন পাতিয়া মোরে ধন্য করিয়াছো। গহনার ছোট্ট বাক্সে স্বর্নের অলংকারের স্থান লইয়াছো অর্ধেক মাপের পেয়াজ খানি। তোমার এই মান সম্মান  দেখিয়াই আমরা আজ আনন্দিত। তোমার দেখা মিললেই চিত্ত মোদের পাগল পাড়া হইয়া উঠে।  এমন চিত্র তোমার দেখিয়া নয়ন ভরা জলেও আমাদের মুখে হাসি উঠিয়া যায় বৈকি। বাজারে তোমার দেখা  না মিললেও  স্বর্নের দোকান বা বড় কোন খাবারের অনুষ্টান আয়োজন স্থলের আশে পাশে তোমার দেখা আমরা পাই।  মাঝে মাঝে তবু দেখা পাই। তিন বেলা কেন পাই না! সেই প্রশ্ন আজ রবীন্দ্রনাথের মত আমি  তোমাকে করিবো না মহামান্য পেয়াজ। কারন রবীন্দ্রনাথের জন্ম ভিটাতেই তোমার জন্ম। তোমার দেশ ও আমার দেশের দালাল ফড়িয়ারা মিলিয়াই  তোমাকে আমাদের চক্ষুর অন্তরাল করিয়াছে। তাই চিরদিন তোমার দেখা না পাইলেও মাঝে মাঝে যে দেখা পাই তাহার ঝাজ চোখে বহিবার স্বাধ্য আমাদের নাই। আমরা হত দরিদ্র দেশের মানুষ। জীবনান্দদ দাশের ছোট্ট নগরীতে থাকি। আমাদের এই হীরার টুকরা ছেলেটিও (জীবনান্দদ) তোমাদের জন্ম স্থান ভারতে গিয়া চির বিদায় হইয়াছে। তাই পেয়াজ তুমি ভেব না কবি তোমার প্রেম পরিয়াছিল।  তিনি পিয়াজের সন্ধানে তোমার দেশে পা বাড়ায় নাই।

পিয়াজ তুমি তোমার জন্মভিটায় বসিয়া এই পত্র মারফত জানিয়া খুশি হইবা যে তোমার মূল্য এখন গরীবের জন্ম ভিটায় আকাশ চুম্বি। দুস্পাপ্যও বটে।  শচীন টেন্ডুলকারের মতই তোমার মূল্য টাকার অংকে সেঞ্চুরী করিয়াছে। তোমার মত চুনো পূটি সাইজের পিয়াজের সেঞ্চুরী দেখিয়া আমরা বিস্মিত। রমজান আলী বাজারে গিয়া তোমার সেঞ্চুরী দেখিয়া মাথা ঘুরিয়া ড্রেনের মধ্যে পরিয়া গিয়াছে। লোকজন তাহাকে উদ্ধার করিয়া হাসপাতালে ভর্তি করিয়াছে। রমজান আলী বর্তমানে ডা: জেড আই খানের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন। জ্ঞান ফিরিবার পর তিনি নাতী-নাতনীদের উদ্দেশ্য করিয়া বলিয়াছেন যে, তিনি পিয়াজের সেঞ্চুরী দেখিয়া বেহুশ হন নাই। কারন নদী মাতৃক এই বাংলাদেশ হচ্ছে জোয়ার – ভাটার দেশ। জোয়ার- ভাটার মতই সব কিছুর দাম এ দেশে কমে এবং বাড়ে।  বৃটিশরাও নাকি বুড়িগঙ্গার জোয়ার-ভাটার দৃশ্য দেখিয়া পালাইয়া গিয়াছিল। যাইবার সময় তাহারা বলিয়া গিয়াছেন এই দেশের নদীতে কখনো পানি উথাল-পাথাল করে আবার কখনো শুকাইয়া যায়। এই দেশের মানুষের চরিত্রও হইতেছে নদীর পানির মত। কখনো তাহারা খুবই শান্ত। আবার কখনো উথাল-পাথাল গর্জন করিয়া বসে।  এই দেশের মানুষ কে শাসন করা বড়ই কঠিন। কিন্ত জোয়ারের পরে ভাটা আসিবে। দাম বাড়িবার পর দাম কমিবে, ইহাই হইতেছে নিয়ম। কিন্ত পেয়াজের বেলায় তাহার কোন নিয়ম কানুন নাই। সে শুধুই বাড়িয়া চলিয়াছে।  একপেশে দাম বাড়িয়া সয়লাব হইবার কারনেই রমজান চাচা মাথা ঘুরিয়া চিৎপটাং হইয়াছেন। রমজান আলী তাহার সাংবাদিক ভাতিজাগো ডাকিয়া কহিলো ভাতিজাগো শোন; আমাদের দেশে প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ টন পিয়াজ দরকার। ইহার মধ্যে মাত্র ৪/৫ লাখ টন পেয়াজ ভারতের দাদাগো দেশে থাইক্যা আমরা আমদানী করি। জুলাই – আগষ্ট মাসে  বলতে গেলে ফি বছরই পেয়াজের আকাল লাগিয়া যায়। ভারতীয় পেয়াজে আমাদের দেশী বাজারের চাহিদা পূরন হইয়া যায়। দাম একটু বেশী থাকে বৈকি! তবে এইবার হুনছি ভারতে নাকি ব্যাপক বৃষ্টিপাত হইয়াছে। তাই পিয়াজের উৎপাদন ভাল হয় নাই। সেইখানের বাজার বৃষ্টির পানিতে টাল – মাটাল হইয়া গিয়াছে। সেই ঢেউ লাগিয়াছে আমাদের বাজারে। এ যেন রবীন্দ্র নাথের গানের মতই সে আগুন ছড়িয়ে গেল, সবখানে সবখানে..। পেয়াজের জন্ম ভিটা হইতে যে আগুন বাংলাদেশের বাজারে ছড়াইয়া পরিয়াছে তাহার প্রভাব পরিয়াছে আরো কয়েকটি দেশে। বাংলাদেশ বিকল্প দেশ হইতে পেয়াজ আমদানী করিতে গিয়া ঝামেলা পোহাইতেছে বলিয়া রমজান চাচা কে জানাইয়াছে খাতুন গঞ্জের ব্যবসায়ীরা। তাহারা বড় বড় আমদানীকারক। সেই আমদানীকারকরা বলিতেছে জাহাজে আমাগো দেশের খাতুনগঞ্জে নাকি পেয়াজ পৌছাইতে ৮/১০ দিন সময় লাগিয়া যায়। পচনশীল দ্রব্য হিসাবে ইহাই ঝুকির কারন হইয়া দাড়াইয়াছে পেয়াজ ব্যবসায়ীদের জন্য।

আমাদের যুগ যুগের চাহিদা পূরনকারী যে পেয়াজ অতি পরিচিত তাহার বেশীর ভাগেরই জন্মস্থান ভারত। ভারতের কাছ থেকে আমরা অনেক শিক্ষা গ্রহনের পর নতুন শিক্ষনীয় হইতেছে পেয়াজের ঝাজ শুধু চোখের জল আনে না। গদিই উল্টাইয়া দিতে পারে। তাহার স্বাক্ষী এই পেয়াজের জন্মস্থান ভারতেই রহিয়াছে। বেশী দিন আগের কথা নহে। ১৯৯৮ সালে দিল্লির মূখ্য মন্ত্রী ছিলেন সুষমা স্বরাজ তখন বর্তমান মূখ্য মন্ত্রী শীলা দীক্ষিতই পেয়াজের দাম লইয়া আম জনতার ক্ষোভ কাজে লাগাইয়া ছিলেন। ভারতের  রাজনীতিবিদদের কাছে শুনিলাম পেয়াজের দামের ধাক্কাতেই নাকি সেই সময় দিল্লীর রাজ্যসভার গদি হারাইয়াছিল বিজেপি তথা সুষমা স্বরাজ।
রমজান চাচা বলিলেন বাংলাদেশ সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হইতেছে আগামী কোরবানী। এই সময় পেয়াজের ব্যাপক চাহিদা হইয়া থাকে। শুনিয়াছি এই চাহিদা পূরন করিবার লক্ষ্যে নাকি চীন, তুরস্ক, পাকিস্তান ও মিয়ানমার হইতে পেয়াজ আমদানী করিবার জন্য সরকার উদ্যোগ গ্রহন করিয়াছে। কোরবানীর চান আকাশে উদিত হইবার পূর্বেই যদি পেয়াজ গন্তব্যে পৌছায় এবং বাজারে পাওয়া যায় তাহা হইলে ভাল। না হইলে সরকারকে দিল্লি’র কথাটি মনে করিবার জন্য রমজান চাচা নছিয়ত করিয়া বলিলেন বাবা আমার তো বয়স শেষ। কোরবানী গরু বা খাসি হয়তো জবাই হইবার আগেই হয়তো আমি চলিয়া যাইবো। ‘আমি যদি দেখবার নাও পারি তাইলে তোমরা দেইখ্যো।’

  সময় মত পেয়াজ না পাইলে বাংলার ঘরে ঘরে আগুন জ্বলিবে। পেয়াজের জন্য যার যা কিছু আছে তা নিয়ে প্রস্তত হইবে কোরবানীর পরই। সাংবাদিক ভাতিজারা প্রশ্ন করিলেন চাচাগো, লবনের জন্য এই দেশে হাজী শরিয়ত উল্লাহর নেতৃত্বে আন্দোলন হইয়াছে। সেই আন্দোলনের নাম ছিল স্ব-রাজ আন্দোলন। এই বার পেয়াজের জন্য আন্দোলন হইলে তাহার নাম কি হইবে? চাচা বলিলেন ‘ ফরাজ’। কেন এই নাম তাহার ব্যাখা করিয়া রমজান চাচা বলিলেন পেয়াজের চাহিদা অনুযায়ী সিংহভাগই বাংলাদেশে উৎপাদন হয়। সামান্য কিছু খাটতি পূরনের সুযোগ কাজে লাগাইয়া ফটকাবাজ ফড়িয়ারা পথে পথে কাটার পরিবর্তে ফুল ছড়াইয়া দিয়া সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন। ‘ফ’ এর ফাপর হইতে বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রন করিতে হইলে আরেকটি আন্দোলন দরকার। যে আন্দোলনের বাতাসে ভাসিয়া যাইবে ফটকাবাজ ফড়িয়াদের বিছাইয়া রাখা ফুল। তাহারা আর জীবনেও বাজারে গিয়া ‘ফ’ শব্দটি উচ্চারন করিবে না। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুলো এ সব টাউট বাটপারদের কাছে মামা বাড়ি কিংবা শ্বশুর বাড়ির ফরাজের মতই। তাই ফরাজ আন্দোলনের মাধ্যমে যৌতুকের অভিশাপের মত এই অভিশাপ্ত চরিত্র গুলো চিরতরে নির্মূল করিতে না পারিলে নতুন প্রজন্মকে না খাইয়া মরিতে হইবে। তাহারা নুন আনিতে গেলে পান্তা ভাতের দাম বাড়িয়া যাইবে। আবার পান্তা ভাত আনিতে গেলে নুনের দাম বাড়াইয়া মতলববাজরা তাদের ভাতে ও পানিতে মারিবে। ইহাদের কবল হইতে রক্ষা পাইতে হইলে বাজার সিন্ডিকেট নামের মজুদদারদের রুখিতে হইবে। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস পত্রের বাজার হইতে সকল প্রকার ফটকাবাজী দূর করাই হইবে এ আন্দোলনের একমাত্র লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং আদর্শ।   

ফেইসবুকে আমরা

পুরনো সংখ্যা

জুলাই ২০১৭
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« জুন    
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১