July 23, 2017

রয়েল বেঙ্গলের মিউ মিউ কান্না—-

--- ৬ অক্টোবর, ২০১৩

images

লিটন বাশার ॥ ২১ জেলার মানুষের স্বপ্নের পদ্মা সেতুর কাজ শেষ তো দূরের কথা প্রায় ৫ বছরেও একটি খুটি পদ্মা নদীর তীরে ফেলা সম্ভব হয় নাই। সেতুর কাজ শুরু করিতে না পারিলেও দূর্নীতির তিলক ঠিকই আমাদের জাতির মুখে কালিমা লেপন করিয়াছে। শুধু পদ্মা সেতু নহে। আমাদের দেশের প্রায় সকল প্রকল্পতেই যেমন দূর্ণীতি হয় তেমনি মাসের মাস, বছরের পর বছর ঝুলিয়া থাকে। তবে ব্যতিক্রম একটি খবর জাতিকে হতবাক করিয়াছে। জাতির কাছে হঠাৎ আসা সু:সংবাদ! হইতেছে , নির্ধারিত সময়ের ১৭ দিন আগেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বহুল আলোচিত রামপাল বিদুৎ কেন্দ্র উদ্বোধন করিয়াছেন। আগামী ২২ অক্টোবর ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদনের ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক মেগা প্রজেক্ট রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উদ্বোধন হওয়ার কথা ছিল । কিন্ত বিদুৎ সংকট নিরসনের জন্য গত শনিবার তাহা উদ্বোধন করা হইয়াছে।

 এই ১৭ দিন আগে উদ্বোধন করার কারনে হয়তো বর্তমান সরকারের মেয়াদেই সাধারন মানুষ ঘরে ঘরে বিদুৎ পাইবে। সুন্দরবন সহ পুরো ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল আলোকিত হইতে। এর দু’দিন আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভারত হইতে বিদুৎ জাতীয় গ্রীডে ক্রয় করিয়া আনিবার জন্য ভারতীয় দাদাদের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এর সাথে টেলিকফারেন্স করিয়াছেন। সেই দিন হইতে রমজান আলীদের গ্রামে আর এক মুহুর্তের জন্যও বিদুৎ যায় না। এই দারুণ খবর টি রমজান আলী সর্বত্র প্রচার করিয়া এবার নৌকা মার্কায় ভোট প্রদানের জন্য প্রচার চালাইয়া যাইতেছে। রমজান ভোটারদের কাছে প্রচারের সময় একজন যুবক তাহার সাথে বেয়াদবী করিয়া বসিলো। ছেলেটির নাম আকবর। গেরামের সবাই তারে আকবর ফাজিল নামে ডাকে। সে গতকাল রমজান চাচারে প্রশ্ন করিলো ‘ নানা দাদা দ্যাশের বিদুৎ এর আলোতে নামাজ পড়িলে কি তাহার আল্লাহ কবুল করিবো’? রমজান চাচার ঝটপট উত্তর ‘ ঐ বেটা বে-কুব, ফাজিল কোথার, বিদুৎ কি আমরা টাকা দিয়া কিনে আনি নাই! তাইলে নামাজ হইবে না কেন? এ সুযোগে রমজান চাচা দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে কুইট রেন্টাল বিদুৎ কেন্দ্র নির্মান সহ বর্তমান সরকারের উল্লেখযোগ্য ভূমিকার কথার ফুল ঝুড়ি ছড়াইতে ভূলিলেন না।  চাচার এত বিদুৎ কাহিনী শুনিয়া আকবর আবারো একটা প্রশ্ন করিলো ‘ দাদা গো এত রেন্টাল বিদুৎ আবার ভারতীয় বিদুৎ, এরপর আবার রামপাল না কি পাল যেন , সেই খানে প্রধানমন্ত্রীর কি দরকার ছিলো বিদুৎ কেন্দ্র উদ্বোধন করিবার? নানা তুমিই তো কইলা , এত বিদুৎ এ সরকার উৎপাদন করিয়াছে যে এখন রাখিবার জায়গা পাও না, তাই হারা গেরামের মধ্যে ঘুইর‌্যা বেড়াইতেছো। নাতী আকবরের কথা শুনিয়া রমজান চাচা মুহুর্তের জন্য উত্তর না পাইয়া কিং কর্তব্য বিমূঢ় হইয়া গেল। এবার আকবর বলিতে লাগিলো নানাজান পেপারে দেখছি বিশেষজ্ঞরা কহিয়াছে  রামপালে বিদুৎ বানাইতে দৈনিক দরকার হইবে ১০ হাজার টন কয়লা। শুধু বিদ্যুৎ নয় সাথে উপহার আছে। রমজান কপাল ভাজ করিয়া জিজ্ঞাসা করিলো নাতীর কাছে উপহার আবার কিসের। আকবর বলিলো আছে নানা, আছে শুধু ১০ হাজার টন কয়লা না, এর সাথে দৈনিক  ১৪২ টন বিষাক্ত সালফার ডাই-অক্সাইড ও ৮৫ টন বিষাক্ত নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড থাকবে। বছরে ৪৭ লাখ ২০ হাজার টন কয়লা পুড়িয়া সাড়ে ৭ লাখ টন ফ্লাই-অ্যাশ পাওয়া যাইবে। শুধু বাতাস নয়, মাটি-পানিও পাবে ২ লাখ টন বটম-অ্যাশ। রমজান চাচা নাতী আকবর কে জিজ্ঞাসা করিলো অ্যাশ কি? আকবর বলিলো ছাই  , ছাই ..। আগুনে কয়লা পুড়লে তা কি হয়! এত কয়লার এই  বিপুল পরিমাণ অ্যাশ নির্গমন হইবে কি ভাবে। রমজানের এমন প্রশ্নের জবাবে আকবর বলিলো বাতাস, পানি বা মাটিতে নিরাপদ টানেল বানিয়ে হয়তো বিদেশে রপ্তানি করিয়া সরকার বিপুল বৈদেশিক মূদ্রা অর্জন করিবে এবং নানা তুমি তাহা প্রচার করিবার জন্যি হারা গেরাম ঘুরবা’। এবার রমজান বুঝিলো তাহারে বেকুফ বানাইবার জন্যই ফাজিল তাহাকে নৌ পথে ও আকাশ পথে ছাই রপ্তানীর কথা বলিয়া বিদ্রুপ করিয়াছে।  রমজান বলিলো তাইলে কি যা শুনেছি তাই ঠিক? বিপুল পরিমান ক্ষতিকারন পদার্থ  আমাদের দেশেই থাকিয়া যাইবে? তাহা কেন্দ্রের  আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়বে ? আকবর বলিলো হ্যা নানা’। এ প্রকল্পের কারনে পরিবেশ হবে দারুণভাবে বিপর্যস্ত। ইকো-সিস্টেম মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। প্রাণ-বৈচিত্র হবে বিপন্ন।

নানা এবং নাতীর তর্ক যুদ্ধ দেখিয়া সেখানে অনেক তরুন – ভির জমাইয়েছে। এদের মধ্যে ফোরকান নামের একজ স্বাধীনের বছর আমেরিকায় গিয়াছিল। সে সম্প্রতি ফিরিয়া আসিয়াছে। ফোরকান তার দেখা একই ধরনের প্রকল্প যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে ১৯৭৯ সালে একটি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছিল বলিয়া সবাইর দৃষ্টি আর্কষ করিলো। ফোরকান বলিলো সেখান  থেকে বছরে ৩০ হাজার টন সালফার ডাই-অক্সাইড তৈরি হচ্ছে। ২০১০ সাল পর্যন্ত বিশেষত সালফার ডাই-অক্সাইডের ভয়াবহ প্রভাব কেন্দ্রটি থেকে ৪৮ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত পৌঁছে সেখানকার পেকান, ওক প্রভৃতি গাছের বাগান মারা পড়িয়াছে বলিয়া তথ্য প্রমান দিল। এ বার গ্রামের আরেক চালাক চেরাগ আলী গুগল ম্যাপের উদাহরন দিয়া বলিতে লাগিলো  রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র হইতে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সুন্দরবন । এরমধ্যেই অংকের ছাত্র ফরিদ উপরোক্ত হিসাব যোগ বিয়োগ করিয়া মিলাইয়া দিয়া বলিলো তাইলে রামপাল থেকে তৈরি হইবে বছরে ৫১ হাজার ৮৩০ টন সালফার ডাই-অক্সাইড যা টেক্সাসের বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির তুলনায় অনেক বেশি হইবে বলিয়াই সবাই একমত পোষন করিলো। টেক্সাসের অভিজ্ঞতা এবং নাতীদের কথাবার্তা শুনিয়া রমজান আলীর চোখ কান খুলিলো। সে পরিষ্কার বুঝিলো রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হইলে আর কোন ভাবেই  সুন্দরবনকে বাঁচাইয়া রাখা  সম্ভব হইবে না।  হয়তো ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যেই বিলীন হইয়া যাইবে পৃথিবীর বিরল সৌন্দর্য্যরে সবুজে ঘেরা সুন্দরবন।

রমজান আলী এবার রাগে ক্ষোভে নাতীদের বলিলো- তোরা এত বড় ধ্বংসের কথা জানিয়াও চুপচাপ কেন? গ্রামের তরুন – যুবকরা বলিলো নানা, তুমি ঠিকই কইছো। আমরা সোচ্চার হইলে সুন্দর বনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার বাচিয়া থাকিবার জন্য আমাদের সাথে হুংকার দিয়ে এই ধ্বংসের জন্য আগাইয়া আসা ভারতীয় দাদাদের তাড়াইয়া দিতো। কিন্ত আমরা শেরে বাংলার দেশের লোক হইয়া বাংলার বাঘের মত গর্জন তো দূরের কথা বিড়ালের মত মিউ মিউ করিতেছি। তাই বাঘেরও আমাদের বিড়ালের মত মিউ মিউ শব্দ শুনিয়া প্রকল্পটি না করিবার জন্য নাকি পা জড়াইয়া ধরিয়া কাদিয়াছে। তাহারা বাচিয়া থাকিবার জন্য করুনা ভিক্ষা চাহিয়াছিল। তাহাদের এই অবস্থা দেখিয়া শিয়াল- হরিন সহ অনেক মায়াবী প্রানী লজ্জায় আতœহত্যা করিয়াছে। কারন যে বাঘ বনের রাজা, তার কন্ঠে আজ আর্তনাদ। যে টাইগারের আজ গর্জন করিয়া উঠিবার কথা সে পা ধরিয়া প্রান ভিক্ষা চাইতেছে। তবুও বাচিয়া থাকিবার প্রতিশ্র“তি পাইতেছে না।

ফেইসবুকে আমরা

পুরনো সংখ্যা

জুলাই ২০১৭
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« জুন    
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১