July 22, 2017

গ্রামীণ জনপদে খেজুর রসে শীতের আমেজ আহরণে ব্যস্ত গাছি

--- ২৩ নভেম্বর, ২০১৩

x

প্রভাতের শিশির ভেজা ঘাস আর ঘণ কুয়াশার চাঁদর, হেমন্তের শেষে শীতের আগমনের বার্তা জানান দিচ্ছে আমাদের। মৌসুমী খেজুর রস দিয়েই গ্রামীণ জনপদে শুরু হয় শীতের আমেজ। শীত যতো বাড়বে খেঁজুর রসের মিষ্টতাও ততো বাড়বে। শীতের সাথে রয়েছে খেঁজুর রসের এক অপূর্ব যোগাযোগ। আর মাত্র কয়েকদিন পরেই গৌরব আর ঐতিহ্যের প্রতীক মধুবৃক্ষ থেকে সু-মধুর রস বের করে গ্রামের ঘরে ঘরে পুরোদমে শুরু হবে পিঠা, পায়েস ও গুড় পাটালী তৈরীর ধুম। গ্রামে গ্রামে খেজুরের রস দিয়ে তৈরি করা নলের গুড়, ঝোলা গুড়, দানা গুড় ও বাটালী গুড়ের মিষ্টি গন্ধেই যেন অর্ধভোজন হয়ে যায়। খেজুর রসের পায়েস, রসে ভেজা পিঠাসহ বিভিন্ন সুস্বাদু খাবারেরতো জুড়ি নেই। প্রতিবছর শীত আসলেই খেজুর রসের পিঠা, পায়েস দিয়ে অতিথি আপ্যায়নের জন্য জামাই-মেয়ে, নাতি-নাতনী, বেয়াই-বেয়াইন কিংবা নিকট আত্মীয়দের নিয়ে দু’একবার উৎসবের আয়োজনতো রয়েছেই।

ইতোমধ্যে খেঁজুর রস সংগ্রহকারী গাছিরা তাদের প্রস্তুতি শেষ করে দা, নলি, কোমরবন্ধ রশি, ভাড় বা হাড়ি সংগ্রহ করে শুরু করেছেন গাছ পরিচর্যার কাজ। অনেক এলাকায়ই খেজুর রস সংগ্রহ করার খবর পাওয়া গেছে, তবে তা সামান্য। শীতের শুরুতেই প্রতি বছরের ন্যায় এবারও দক্ষিণাঞ্চলসহ গোটা বরিশালের বিভিন্ন উপজেলার গাছিরা খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করার জন্য ব্যস্ত সময় পার করছেন। প্রাচীণ বাংলার ঐতিহ্য খেজুর গাছ আর গুড়ের জন্য একসময় এ অঞ্চল বিখ্যাত ছিলো। অনেকে শখেরবশে খেজুর গাছকে মধুবৃক্ষ বলে থাকেন। শীত শুরু হওয়ার সাথে সাথে খেজুর গাছ কাটার প্রতিযোগীতা পড়েছে দখিণের গাছিদের মধ্যে। তাই খেজুরের রস আহরণের জন্য এখন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন এসব এলাকার গাছিরা। খেজুর গাছ থেকে রস বের করার জন্য গাছিরা শুরু করছের প্রাথমিক পরিচর্যা। স্থানীয় ভাষায় এটাকে গাছ ছোলা বলা হয়ে থাকে। ছোলা গাছে এক সপ্তাহ পরেই আবার চাষ দিয়ে (কেটে পরিস্কার করে) নল লাগানো হবে। খেজুর গাছে তিন স্তরে কাজ করার পর রস আহরণ শুরু হয়। প্রাথমিক পরিচর্যারত গাছ থেকে আর কিছুদিন পরেই খেজুর রস পাওয়া যাবে। ওই সময় খেজুর গাছ থেকে রস আহরণকারী গাছিদের প্রাণ ভরে উঠবে আনন্দে। যদিও আগের মত খেজুর গাছ না থাকায় এখন আর সেই রমরমা অবস্থা নেই। ফলে শীতকাল আসলেই অযতেœ-অবহেলায় পড়ে থাকা গ্রামীণ জনপদের খেজুর গাছের কদর বেড়ে যায়।

গৌরনদী উপজেলার গেরাকুল গ্রামের ১১৫ বছর বয়সী প্রবীণ ব্যক্তিত্ব আমজেদ আলী সরদার জানান, যৌবণে তিনি নিজেই খেজুর গাছ থেকে গাছি হিসেবে রস সংগ্রহ করেছেন। ওইসময় তিনি খেজুর গাছ থেকে মিষ্টি রস সংগ্রহ করে তা জ্বালিয়ে দানা গুড় ও পাটালি গুড় তৈরি করতেন। তিনি আরো জানান, খেজুরের গুড় থেকে এক সময় বাদামি চিনিও তৈরি করা হতো। যার স্বাদ ও ঘ্রাণ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বরিশালের বিভিন্ন উপজেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শীতের শুরুতেই গ্রামীণ জনপদে প্রতিযোগীতার মাধ্যমে শুরু হয়েছে খেজুর গাছ কেটে রস নামানোর কাজ। শীতকে স্বাগত জানাতে বিভিন্ন এলাকার গাছিরা খুব জোরেসোরেই শুরু করেছেন খেজুর গাছ পরিচর্যার কাজ। আর মাত্র কয়েক দিন পরেই শুরু হবে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যের প্রতীক খেজুর গাছকে ঘিরে উৎসবমুখর পরিবেশ। বাবুগঞ্জের ষাটোর্ধ্ব জুয়েল খলিফা জানান, এসময় খেজুর রসের নলেন গুড়ের মৌ মৌ গন্ধে ভরে উঠতো গ্রাম্য জনপদ। খেজুর রস দিয়ে গৃহবধূদের সুস্বাদু পায়েস, বিভিন্ন ধরনের রসে ভেজানো পিঠা তৈরির ধুম পড়তো। রসনা তৃপ্তিতে খেজুরের নলেন গুড়ের পাটালির কোন জুড়ি ছিলোনা। গ্রাম্য জনপদের সাধারণ মানুষ শীতের সকালে ঘুম থেকে উঠে কাঁপতে কাঁপতে ঠান্ডা খেজুর রস না খেলে যেন দিনটাই মাটি হয়ে যেতো। কিন্তুইট ভাটার আগ্রাসনের কারনে আগের তুলনায় খেজুর গাছের সংখ্যা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। ইটভাটায় খেজুর গাছ পোড়ানো আইনত নিষিদ্ধ হওয়ার পরেও ইটভাটার মালিকেরা সবকিছু ম্যানেজ করে ধ্বংস করে চলেছে খেঁজুর গাছ। গত কয়েক বছর ধরে ইট ভাটার জ্বালানি হিসেবে খেজুর গাছকে ব্যবহার করায় বৃহত্তর দক্ষিণাঞ্চল থেকে দ্রুত খেজুর গাছ ফুরিয়ে যেতে শুরু করেছে। ফলে এ জনপদের মানুষ এখন খেজুর রসের মজার মজার খাবার অনেকটাই হারাতে বসছে। এক্ষেত্রে বন বিভাগ কোন কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহন না করলে ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে খেজুর গাছ শুধু আরব্য উপনাস্যের গল্পে পরিনত হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

জেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ঐতিহ্যবাহী এ খেঁজুর রসের উৎপাদন বাড়াতে হলে টিকিয়ে রাখতে হবে খেজুর গাছের অস্তিত্ব। আর সে জন্য যথাযথ ভাবে পরিবেশ আইন প্রয়োগের মাধ্যমে ইটভাটাসহ যেকোন বৃক্ষ নিধনকারীদের হাত থেকে খেঁজুর গাছ রক্ষা করতে হবে। সূত্রে আরো জানা গেছে, শুধু সরকারি ভাবেই নয়; সংশ্লিষ্ট কৃষি বিভাগ থেকেও কৃষকদের খেজুর গাছ লাগানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বাড়ির আনাচে-কানাচে, রাস্তার পার্শ্বের পরিত্যক্তস্থানে কৃষকেরা পর্যাপ্ত পরিমান খেজুর গাছ রোপন করলে ভবিষ্যত প্রজন্মকে রস ও গুড়ের চাহিদা মেটানো সক্ষম হবে।  

 লেখক : খোকন আহম্মেদ হীরা

ফেইসবুকে আমরা

পুরনো সংখ্যা

জুলাই ২০১৭
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« জুন    
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১