September 21, 2017

বরিশালে বড় দিনের উৎসবের আমেজ নেই

--- ২৪ ডিসেম্বর, ২০১৩

Barisal--pic--23-12=01

লিটন বাশার ॥ মানব সভ্যতার শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যে যিশুখ্রীষ্ট আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন তার অনুসারী খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের লোকজন এখন শান্তি ভঙ্গের আশংকায় এখানে বড়দিনের কর্মসূচী গত কয়েক বছর ধরে পালন করেন যথা সময়ের পূর্বেই। এবার রাজনৈতিক উপ্ততার কারনে বড়দিন পালনের জন্য খ্রীষ্টান পরিবার গুলোতে তেমন উৎসবের আমেজ নেই। এখানে খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের ৩টি গোত্রের প্রায় ১১ হাজার লোক বসবাস করেন। নগরীতে  খ্রীষ্টানদের জন্য ৫টি কলোনী রয়েছে। কাউনিয়া গরুরহাট, কাশীপুর, মতাসর, সাগরদী  নবগ্রাম ও ইউলিয়াম কলোনী। এ সকল কলোনী অনেক পূর্বেই প্রতিষ্ঠিত হয়। সবচেয়ে বড় কলোনী নবগ্রাম রোডের গোলপুকুর পাড়ে। এ কলোনী ঘিরে এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মাদার তেরেসা হোম নামের একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। এক সময় অক্সফোর্ড মিশন চ্যারিটি হোমের চিকিৎসা সেবা দেয়া হলেও কালের বিবর্তনে তা বন্ধ হয়ে যায়। দু’ যুগ পূর্বে ঐ চ্যারিটি হোম, বন্ধ হলেও এখানকার  মানুষের মুখে এখনো রয়েছে তার সুনাম।
তথ্য সূত্র মতে, এই হোমেই জন্ম গ্রহণ করেছিলেন বিশ্ব শান্তির অগ্রদূত নোবেল বিজয়ী  ডেজমন্ড টুটু। তার পিতা এ মিশনের পাদ্রী ছিলেন। ডেজমন টুটু নোবেল বিজয়ী হওয়ার পর মার্কিন এক ফটোগ্রাফার ডেজমন্ড টুটুর জন্মস্থান ঐ হোমে ছবি তুলতে আসলে বরিশালে হৈচৈ পড়ে যায়। বরিশালে এংলিক্যান (প্রটেস্টান), ব্যাপ্টিষ্ট ও ক্যাথলিক এই ৩টি গোত্রের জন্য আলাদা আলাদা উপসনালয় রয়েছে। ২৫ ডিসেম্বরের বড়দিনে এসব গোত্রের লোকজন যার যার উপসনালয়ে ধর্মীয় প্রার্থনা করে থাকেন।
ইউলিয়াম পাড়ায় বড়
দিনের আমেজ নেই
 ব্যাপ্টিষ্টরা বাস করেন নগরীর উইলিয়াম পাড়ায়। তারা পার্শ্ববর্তী ব্যাপ্টিষ্ট মিশনেই বড়দিনের প্রার্থনা করেন। নগরীর ঐ সড়কটি এখন আর উইলিয়াম পাড়া হিসেবে কেউ চেনে না। তার নাম হয়েছে ব্যাপ্টিষ্ট মিশন সড়ক। ইউলিয়াম পাড়ার মূল্যবান সম্পত্তি দখলের জন্য একটি মহল গত এক বছর যাবত পায়তারা শুরু করে। তারা সেখানে অবৈধ স্থাপনাও তৈরী করেছে। ফলে ভিটে মাটি হারানোর আশংকা থাকা খ্রীষ্টান পরিবার গুলোতে নেই বড়দিনের উৎসব আমেজ।
ক্যাথলিকরা শান্তিতে নেই
ক্যাথলিকদের প্রার্থনাস্থল সদর রোডের ক্যাথলিক চার্চ। ১৮৬৪ সালে সাধু পিটারের গীর্জা হিসেবে ৪ একর জমির উপর এ চার্চ প্রতিষ্ঠিত করা হয়। এ পর্যন্ত ৭০ জন পালক পুরোহিত এ চার্চের দায়িত্ব পালন করেছেন। এ চার্চের পাশেই রয়েছে ঐতিহ্যবাহী উদয়ন স্কুল ও ফজলুল হক এভিনিউতে এংলিকানদের চার্চ। এখানেও ধর্মীয় নেতার দায়িত্ব পালন করছেন একজন পাদ্রী পুরোহিত। চার্চের নিকটবর্তী পুকুরটি দখলের পায়তারা চলছে। ফলে শান্তি নেই ক্যাথলিকদের মনেও।
এংলিকানরা যান
অক্সফোর্ড মিশনে
 এংলিকানরা বড়দিনের উৎসব পালন করতে যান নগরীর অক্সফোর্ড মিশনে। এক সময় এই ৩টি উপসনালয়ে ধর্মীয় প্রার্থনা শুরু হোত রাত ১২টা ১ মিনিটে। তখন ফাদার, পুরোহিত কিংবা পাদ্রী ঘন্টা বাজিয়ে ধর্মীয় উৎসব শুরু করতেন। রাতভর চলত উৎসব। কিন্তু রাজনৈতিক সংঘাত, সন্ত্রাস আর নানা টানাপোড়নের কারণে সেই দিন আর খ্রীষ্টানদের নেই। এখানের ধর্মীয় নেতা এবং খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের লোকজনের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, এক যুগের বেশী সময় ধরে উৎসব শুরু হয় রাত ১০টার মধ্যে এবং তা শেষ হয় ১২টার আগেই। এবার আরো আগে শুরু হবে অনুষ্টান। অনাকাঙ্খিত ঘটনা এড়াতে এবার কর্মসূচী আরো সংকুচিত করা হয়েছে।
মিশনারী সেবায়
পিছিয়ে পড়ছে খ্রীষ্টানরা
চার্চের দায়িত্বে থাকা কয়েক জন  ফাদার জানান, শুধুু ধর্মীয় উৎসব নয় সব দিক থেকেই এখানের খ্রীষ্টানরা পিছিয়ে পড়েছে। চ্যারিটি হোমের সেবার কথা উল্লেখ করে বলেন, এক সময় যে কোন ধর্মের মানুষ এই হোমে তার সন্তানের জন্ম দিতে পারলে সে গর্বিত পিতামাতা হিসেবে ধন্য হোত। চ্যারিটি হোম বন্ধ হয়ে যাবার পর ১৯৯৩ সনের ১০ জানুয়ারী নবগ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয়মাদার তেরেসা হোম। অক্সফোর্ড মিশনের চ্যারিটি হোমের সঙ্গে মাদারতেরেসা হোমের কোন সম্পর্ক নেই। চ্যারিটি হোম পরিচালনা করতেন ব্যাপ্টিষ্টরা। আর তেরেসা হোমটি পরিচালনা করেন ক্যাথলিকরা। শুধু গোত্র নয় সকল ধর্মের মানুষই সেখানে সেবা নিতে পারেন। তবে সেখানে সেবা দানের সুযোগ খুব কম। মাত্র ৩০ শয্যার এ হোমে অনাথ শিশু আর বৃদ্ধরাই যেয়ে থাকেন। হোমের দায়িত্বে থাকা সিস্টার জানান, গুরুতর রোগী হলে তাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। এছাড়া প্রতি শুক্রবার হাসপাতাল থেকে একজন ডাক্তার আসেন এ হোমে। রোগীদের খাবার-দাবার হোম কর্তৃপক্ষই প্রদান করেন। হোমে যারা কাজ করেন তারাও স্বেচ্ছামূলক। তেমন কোন বেতন পান না। ৪ জন সিস্টার মাত্র একহাজার টাকা করে সম্মানী পান। কর্মচারী হিসেবে যারা আছেন তারাও মাসে ৪’শ থেকে ৫’শ টাকা পান। বড়দিনে এ হোমে কোন উৎসব হয় না। তবে বড়দিনের পূর্বেই দরিদ্র ও অনাথ শিশুদের ভাল খাবার ও নতুন পোশাক প্রদান করেন হোম কর্তৃপক্ষ। প্রতি রবিবার শিশুরা ভাল খাবার খেতে আসে এ হোমে। হোম কর্র্র্র্র্তৃপক্ষ জানান, প্রচারের জন্য কখনোই হোমের ছবি তুলতে দেয়া হয় না। কারণ মাদারতেরেসা নিজেই ছিলেন প্রচার বিমুখ। ভারতের কেন্দ্রীয় মাদারতেরেসা কল্যাণ ট্রাষ্টের উদ্যোগে হোমটি গড়ে উঠলেও এখন পরিচালিত হয় সম্পূর্ণ দেশীয় অনুদানে। দেশের ধর্ণাঢ্য ব্যক্তিরা হোমে আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে থাকেন। এখানের পাদ্রী পুরোহিতরা জানান, বিগত দিনের খ্রীষ্টান ধর্মালম্বীদের বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের যে বিদেশী সাহায্য আসত তা এখন বলতে গেলে একেবারেই বন্ধ। দেশীয় সাহায্য কিংবা প্রতিষ্ঠানের আয় থেকেই এসব কাজ চলছে।
৩ গোত্রের ৩ সমাধিস্থল
তিন গোত্রের খ্রীষ্টানদের মৃত্যুর পরও সমাধিস্থ করা হয় ৩টি কবর স্থানে। ব্যাপ্টিষ্ট ও ক্যাথলিকদের জন্য সাগরদীতে আলাদা দু’টি গোরস্থান রয়েছে। এংলিকানদের কবর দেয়া হয় অক্সফোর্ড মিশনে। নগরের সবচেয়ে পরিচিত সাহেবের গোরস্থানে এখন আর কবর দেয়ার তেমন কোন জায়গা নেই। এক সময় বৃটিশ পুরোহিতদের এখানে কবর দেয়া হোত। সেই সাহেবী ভাব এখনো বজায় আছে। ২/১ জন উচ্চবিত্ত খ্রীষ্টান এ কবরের মাটি পান অনেক টাকার বিনিময়ে। বেশী টাকা দিয়ে মধ্যবিত্ত কিংবা নিুবিত্তরা এখানে সমাধি করতে যেতে পারেন না। খ্রীষ্টান ধর্ম অনুসারে আত্মহত্যার পর তাকে কবর দেয়ার বিধান না থাকলেও বর্তমানে সামাজিক কারণে সাগরদীর একটি গোরস্থানে তাদের জন্য বর্ধিত তৈরী করে কবর দেয়া হয়।  
খ্রীষ্টান ধর্মাবলম্বীদের ধর্মগুরুদের ব্যক্তিগত জীবন বলতে কিছু নেই। তারা ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালনের পাশাপাশি সামাজিক ও সেবামূলক কাজ কর্মে নিজেদের সর্বদা ব্যস্ত রাখেন। কোমার্ঘ, দারিদ্র, বাধ্যতা এ তিনটি ব্রত নিয়ে তারা সাদামাটা জীবন যাপন করে থাকেন। এক কথায় তারা ত্যাগ করেন-ভোগ করেন না।
পুরোহিতদের
জীবন চলছে কষ্টে
গৌরনদী – আগৈলঝাড়া ও বাকেরগঞ্জ উপজেলা সহ নগরীর বাইরেই  খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের আরো ১০ হাজার লোক বসবাস করেন। বড় দিনের আগে কয়েকটি ধর্মপল্ল¬ী ঘুরে দেখা গেছে খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের ক্যাথলিক, ব্যাপ্টিষ্ট, অক্সফোর্ট, এজি চার্চসহ হাজার মানুষ এখন আর আগের মত খুব একটা ভাল নেই। বিদেশী মিশনারী সেবা ও অনুদান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চার্চের  পালক পুরোহিতদের দৈনন্দিন জীবনও চলছে বহু কষ্টে। বিদেশী সেই পুরোহিতদের স্থান দখল করেছেন স্থানীয় ধর্ম যাজকরা। বিদশী মিশন প্রধানরা এখন আর তেমন গীর্জার দায়িত্বে নেই। এ সুযোগে কিছু দেশীয় বকধার্মিক খ্রীষ্টানদের পুরনো সম্পত্তি নামে বেনামে ভূয়া সংগঠন তৈরী করে তুলে দিচ্ছে ভূমিদস্যুদের হাতে। পুরোহিতদেরও এখন না খেয়ে থাকার অবস্থা। অথচ পুরোহিতরা খ্রীষ্টযাগ (প্রধান প্রার্থনা) ছাড়াও বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক কাজে সমাজের উন্নয়ন ও উন্নতির ক্ষেত্রে এখনো গুরুতপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। ধর্মীয় প্রচারের মাধ্যমে মানুষকে সৎপথে আনায়ন ও নৈতিকতাবোধ জাগিয়ে তোলার আহবানসহ বিবাহ দেয়া, রোগীদের জন্য প্রার্থনা ও আর্শিবাদ, পরিবার কল্যান, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রন, গণশিক্ষা, নারী শিক্ষা, যৌতুক রোধ, প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরির্চযা, এইডস প্রতিরোধ, ধুমপান রোধ, বৃক্ষরোপনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পালক পুরোহিতগণ অসামান্য অবদান রেখে যাচ্ছেন।
খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের ক্যাথলিক গোত্রের সকল ও অক্সফোর্ড গোত্রের কিছু পুরোহিতরা সন্ন্যাস (চিরকুমার) জীবন যাপন করছেন। ব্যক্তিগত ভাবে তারা কিছুই পান না। তাদের জীবন যাপনের যাবতীয় ব্যয়ভার চার্চ বহন করে থাকেন।

ফেইসবুকে আমরা

পুরনো সংখ্যা

সেপ্টেম্বর ২০১৭
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« আগষ্ট    
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০