September 25, 2017

প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থী ঝড়ে পড়া রোধে করণীয়

--- ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

30

মোঃআঃকুদ্‌দূস, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, বোরহানউদ্দিন, ভোলা।।

আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রাথমিক স্তরের প্রধানতম সমস্যা শিশুদের স্কুল থেকে ঝড়ে পড়া। শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে এই ঝড়ে পড়ার হার বেশি। সরকারি হিসাব মতে, গ্রামঞ্চলে প্রায় এক-পঞ্চমাংশ শিশুরা প্রাথমিক স্তর অতিক্রম করে মাধ্যমিক স্তরে পৌঁছতে পারে না। অথচ আমাদের জাতীয় উন্নতির ধারাবাহিককতা অব্যাহত রাখতে শিক্ষার হার শতভাগে উন্নীত করা প্রয়োজন। কেননা, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন সূচকের প্রতিটিতে সাফল্য ধরে রাখার পূর্বশর্ত হচ্ছে মানসম্মত শিক্ষা। তাছাড়া, প্রাথমিক স্তরে ঝড়ে পড়া অধিকাংশ শিক্ষার্থীরা তাদের জীবনে যেমন উৎপাদনমূলক (Productive)কোন কাজ করতে পারে না তেমনি তারা জীবনের পরবর্তীতে নানামূখী সামাজিক অপরাধ প্রবণতার সাথে জাড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশের স্কুলে ভর্তির (School Enrollment)হার পৃথিবীর উন্নয়নশীল অনেক দেশের চেয়ে ভালো। কিন্তু ঝড়ে পড়ার হার রোধ করতে না পারায় সে সাফল্য ম্লান হয়ে যাচ্ছে। আলোচ্য নিবন্ধে আমার কর্মস্থল উপজেলার বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাথে নানামুখী সম্পৃক্ততার ফলে অর্জিত বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে এই ঝড়ে পড়ার হার হ্রাসে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার তা নিয়ে আলোকপাত করার প্রয়াস পাব। ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে। আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। এই ব্রতকে সামনে রেখে প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে শিশুবান্ধব উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। শিশুরা সর্বদাই অনুকরণ প্রিয়। অন্যরা যা করে তা-ই তারা অনুকরণ করে থাকে। তাই প্রতিটি বিদ্যালয়ে শিশুদের উপযোগী খেলাধুলা ও  বিনোদনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। শিশুরা পড়াশোনা করবে আবার পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে আনন্দ বিনোদনে মেতে থাকবে। এতে একঘুঁয়েমি কমবে ও পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হবে এবং শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বিদ্যালয়মূখী হবে। তাছাড়া বিদ্যালয়ে আকর্ষণীয় চার্ট, ছবি, দোলনা ইত্যাদি প্রতিস্থাপন করা যতে পারে, যেগুলো দেখে শিশুরা আনন্দ উপভোগ করবে। বিদ্যালয়ের চারপাশের পরিবেশ সুন্দর রাখাও জরুরি। যাতে করে শিশুরা বিদ্যালয়ের পরিবেশ মানিয়ে সহপাঠী বন্ধুদের সাথে আনন্দময় সময় অতিবাহিত করতে পারে। এতে ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা স্কুলমূখী হবে এবং ঝড়ে পড়া বহুলাংশে রোধ হবে।

শিশুদের শিক্ষাদানের কৌশল সম্পর্কে শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে। শিশুদের সাথে আচার-ব্যবহারে শিক্ষকের মতো না হয়ে বন্ধু সুলভ আচরণ করা প্রয়োজন। শ্রেণিতে পড়া অতি সহজ ও সাবলীল ভাষায় উপস্থাপন করতে হবে, যাতে তা শিশুদের বোধগম্য হয়। যে সেকল শিশু মেধায় দুর্বল তাদেরকে নিবিড় পরিচর্চার মাধ্যমে পাঠদান করতে হবে। ক্লাসে প্রবেশ করে শিক্ষকগণ কুশল বিনিময় করলে ভালো হয়। তাছাড়া শিক্ষকগণ পড়ার ছলে গান-ছড়া, কৌতুক, ধাঁ-ধাঁ, কবিতা আবৃত্তি ইত্যাদির মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষের পাঠদানকে প্রাণবন্ত করে তুলবেন। পড়াশোনা বা অন্যকোন কারণে শিশুদেরকে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন বা ভীতিমূলক কোন শাস্তি/ তিরস্কার না করে ভালো কাজের জন্য প্রশংসা করলে শিশু শিক্ষার্থীরা পড়ালেখার প্রতি মনোযোগী হবে এবং বিদ্যালয় থেকে পলায়ন করবে না। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ইমানের অঙ্গ। সকলেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পূজারী। যে বিদ্যালয়ের পরিবেশ যত সুন্দর সে বিদ্যালয়ের পড়াশোনার পরিবেশও তত সুন্দর। প্রধান শিক্ষকগণ শিশুদেরকে পোশাক-পরিচ্ছদ, বাহ্যিক আবরণ পরিপাটি হয়ে বিদ্যালয়ে আসার বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন। তাছাড়া বিদ্যালয়ের সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য চারপাশে ফুলের বাগান সৃজন এবং ছায়া প্রদাণকারী বৃক্ষ রোপন করতে পারেন। বিদ্যালয়ে যথাসাধ্য ইনডোর এবং আউটডোর খেলার সরঞ্জাম স্থাপন করা যেতে পারে। গ্রামাঞ্চলে বিদ্যালয়ে সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য সংযোগ সড়কটি যথাসম্ভব সুন্দর এবং প্রশস্ত করা প্রয়োজন। বিদ্যালয়ের পরিবেশ সুন্দর হলে- শিশুরা বিদ্যালয়ের প্রতি আকৃষ্ট হবে এবং নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসবে। ফলশ্রুতিতে শিশু ঝড়ে পড়া রোধ হবে। নিয়মিত ক্লাসের বা‌ইরে প্রত্যেক বিদ্যালয়ে সহপাঠ কার্যক্রম চালু রাখা প্রয়োজন। ক্লাস শুরুর পূর্বে অথবা ছুটির পর বা প্রতি সপ্তাহে অন্তত একদিন নৃত্য, সংগীত, কবিতা আবৃত্তির অনুষ্ঠান করা আবশ্যক। এতে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ সাধিত হয় এবং দলগতভাবে অনুষ্ঠান উপভোগের ফলে ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি হয়। একে অপরের সাথে ভাব বিনিময় করে লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। শিশুরা আনন্দ পায়। ফলশ্রুতিতে অভিভাবকের শাসন ছাড়াই প্রতিদিন স্ব-স্ব উদ্যোগে শিশুরা বিদ্যালয়গামী হবে। এতে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতির হার কমিয়ে আনা সহজতর হবে।

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ শিশুই গরীব ও মধ্যবিত্ত পরিবার হতে আগত। তাঁরা সকালে পান্তা ভাত খেয়ে বিদ্যালয়ে আসে। আবার অনেকেই অর্ধ-পেটে বা খালি পেটে স্কুলে চলে আসে। দীর্ঘসময় তাদের স্কুলে কাটাতে হয়। ক্ষুধার কারণে পড়ার সময় অনেকই ঝিমিয়ে পরে। বিরতির সময় নাস্তা বা টিফিনের ব্যবস্থা করা গেলে শিশুরা সতেজ হয়ে ওঠবে এবং পুনরায় মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করবে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে সরকারি/ সমাজের ধনাঢ্য ব্যক্তি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা অন্যান্য দাতাদের আর্থিক সহায়তা নিয়ে শিশুদের জন্য মিড ডে মিল কার্যক্রম চালু করা গেলে বিদ্যালয়ে শিশু উপস্থিতির হার বৃদ্ধি পাবে এবং শিশু ঝড়ে পড়া কমবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঝড়ে পড়া রোধ কল্পে শিশুদের উপযোগী খেলাধুলার ব্যবস্থা করা বাঞ্ছনীয়। ছোটদের ব্যবহার উপযোগী ক্রিকেট সেট, ফুটবল, লুডু, দাবা কোট শিশুদের মাঝে বিতরণ করা যেতে পারে। এতে শিশুদের মানসিক উৎকর্ষতা বৃদ্ধির সাথে সাথে বুদ্ধি দীপ্ততা বৃদ্ধি পাবে। খেলাধুলায় অংশগ্রহণের সুযোগ করা গেলে শিশুদের বিদ্যালয়ে আগমনে আগ্রহের সৃষ্টি হবে। অনেক শিশু পড়ালেখায় তেমন ভালো না হলেও খেলাধুলায় ভালো। এসব শিশুরা খেলাধুলায় অংশগ্রহণের লোভে বিদ্যালয়ে আসবে। তাছাড়া খেলাধুলায় সুস্বাস্থ্য গঠিত হয়। স্বাস্থ্য ভালো থাকলে মনও ভালো থাকে। তাই ঝড়ে পড়া রোধে এ বিষয়টি প্রতিষ্ঠান প্রধানগণ ভেবে দেখতে পারেন। প্রতিটি বিদ্যালয়ের ম্যানিজিং কমিটি শিক্ষার মান, শিশুদের নিয়মিত উপস্থিতি, বিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়ার লক্ষ্যে মাঝে মাঝে অভিভাবকদের নিয়ে মতবিনিময় সভার আয়োজন করতে পারেন। ফলে কোনো শিশু স্কুলে না আসলে কী কারণে আসছেনা তার কারণ সহজে জানা যায় বা পরীক্ষায় কেমন ফলাফল অর্জন করেছে ইত্যাদি বিষয়ে তাদেরকে অবগত করানো যায়। এতে অভিভাবকদের মাঝে শিক্ষার বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি হয় এবং তারা শিশুদেরকে বিদ্যালয়ে পাঠাতে উদ্বুদ্ধ হবেন।

প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অধিভূক্ত এলাকায় বিদ্যালয়গামী শিশুদের একটি পরিপূর্ণ তালিকা থাকা প্রয়োজন। সরকারিভাবে এই তালিকা করার কথা থাকলেও অনেক শিক্ষকই বিষয়টি এড়িয়ে যান। এ তালিকার মাধ্যমে কতজন শিশু বিদ্যালয়গামী হয়েছে এবং কতজন শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি হয় নি তা খুব সহজে জানা যায়। ফলে (Catchment Area) অধিভূক্ত এলাকায় বিদ্যালয় গমনোপযোগী শিশুদের মধ্যে যারা স্কুল ফাঁকি দিচ্ছে সেটা নির্ধারণ করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। এতে করে বিদ্যালয়ে অভর্তিকৃত বা অনুপস্থিত শিশুদের হার কার্যকরভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। শিক্ষকগণ পাঠ উপযোগী গল্পের মাধ্যমে পাঠদান শুরু করলে শিশু আনন্দ পাবে। এতে লেখাপড়ার প্রতি তাদের ভয় কাটবে এবং শিশুরা শিক্ষকগণকে শিক্ষক না ভেবে হিতাকাঙ্ক্ষী বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে। শুধু পাঠ্যপুস্তকের পাঠের মাধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে শিশুদের বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে সম্পৃক্ত করে পাঠদান করতে হবে। এসব কাজে শিক্ষক নিজেও সস্পৃক্ত হবেন। এতে শিশুরা আনন্দ পাবেন। শিক্ষক চেষ্টা করবেন বিভিন্ন শিক্ষোপকরণ শিশুদের দ্বারা তৈরি করাতে। এভাবে আনন্দ দানের মাধ্যমে পাঠদান করা গেলে শিশুরা স্কুল পালাবে না।

প্রাথমিক স্তরের শিশু ঝড়ে পড়া রোধ কল্পে  শিশুবান্ধব পাঠপুস্তক প্রণয়ন করা প্রয়োজন। সহজ-সরল ও সাবলীল ভাষায় এমন পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করতে হবে যাতে শিশুরা আনন্দের ছলে পাঠ গ্রহণ করে শিখনফল অর্জন করতে পারে। পাঠ্যপুস্তকে বিভিন্ন ছবি প্রদর্শন করতে হবে। গল্প, কবিতার ভাষা হবে সহজবোধ্য। গুরুগম্ভীর, দুর্বোধ্য ও অনুধাবনের অনুপযোগী শব্দ বা বাক্য শিশুদের জন্য প্রণীত পাঠ্যপুস্তকে ব্যবহার না করাই ভালো। পাঠ্যপুস্তক যদি একবার পড়েই শিশুরা বুঝতে পারে, তবে তা সহজভাবে গ্রহণ করবে। পড়া মুখস্ত করার বদ অভ্যাস থেকে তারা বেরিয়ে আসবে। ঝড়ে পড়া রোধ করার জন্য বিদ্যালয়ে শিশুদেরকে নিজের বাড়ির ন্যায় পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। তারা যেন বুঝতে না পারে স্কুলে যাওয়া এবং পড়াশোনা কষ্টের কাজ। তাছাড়া তাদের যাতায়াত পথে কোন বখাটে বা দুষ্ট প্রকৃতির কেউ যাতে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করতে না পারে সে বিষয়ে শিক্ষক-অভিভাবক উভয়কে লক্ষ রাখতে হবে। শিশুকে কোনরকম বেত্রাঘাত বা অপমানজনক  শাস্তি দেয়া হতে বিরত থাকতে হবে। এমনকি কোন শিশুর সামনে অন্য কোনো শিশুকেও এসব শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হতে বিরত থাকতে হবে। মেয়ে শিশুদের বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। সর্বোপরি, প্রাথমিক স্তরে ঝড়ে পড়া (Drop Out)হার হ্রাস করার জন্য সরকার, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, এসএমসি ও অভিভাবকদের সমন্বিত প্রয়াস দরকার। মূল ভূমিকা সরকারকেই নিতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারের নীতিমালা আরও অধিকতর সুস্পষ্ট, বাস্তবভিত্তিক ও পাকাপোক্ত করা প্রয়োজন। ‘মিড ডে মিল’ কার্যক্রমের সফল বাস্তবায়নে সামান্য পরিমাণ হলেও সরকারের আলাদা বরাদ্দ রাখা উচিত। প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আনন্দমূখর ও শিশুবান্ধব পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা সর্বাগ্রে দরকার। একইসাথে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষকদের আচরণ (Attitude),              মন-মানসিকতা (MindSet)ওসচেতনতা (Awareness)এরজায়গাটিতে আমূল পরিবর্তন আনায়নের বিকল্প নেই।

ফেইসবুকে আমরা

পুরনো সংখ্যা

সেপ্টেম্বর ২০১৭
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« আগষ্ট    
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০