September 25, 2017

চরাঞ্চলে প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়ন

--- ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

30

মোঃ আঃ কুদদূস, উপজেলা নির্বাহি অফিসার, বোরহানউদ্দিন, ভোলা ।।

বাংলাদেশের বৃহত্তম দ্বীপ ভোলা। ছোট বড় অসংখ্য নাম জানা অজানা চর নিয়ে “কুইন
আইল্যান্ড অব বাংলাদেশ” তথা ভোলা দ্বীপটি গঠিত। বর্তমানে এর জনসংখ্যা প্রায় ২২
লাখ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সম্পদে সমৃদ্ধ এই জনপদের প্রধান সমস্যা হচ্ছে
শিক্ষার হার। এই দ্বীপ জেলার শিক্ষার হার জাতীয় হারের চেয়ে অনেক কম। ২০১১
সালের আদমশুমারি অনুযায়ী এখানের শিক্ষার হার ৩৪%। শিক্ষার এই দৈনতা নিয়ে আর
যাই হোক এই জনপদের সামাজিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাছাড়া শিক্ষার হার বৃদ্ধি করতে
হলে সর্বপ্রথম নজর দিতে হবে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার মান্নোয়নের দিকে। কারণ,
এখানে প্রাথমিকে ভর্তির হার কম। বিদ্যালয়ে গমনোপযোগী অনেক শিশু এখনো ভর্তির
বাইরে রয়ে গেছে। এখানে চাকুরি করার সুবাদে নানা শ্রেণি পেশার মানুষের সাথে
সম্মিলনের সুযোগ ঘটায় এই চরাঞ্চলের শিক্ষার উন্নয়নের বিষয়ে যেসব করনীয় বলে মনে
হয়েছে সে বিষয়ে এই নিবন্ধ আলোকপাত করার প্রয়াস  পাব।

বাংলাদেশের উপকূলীয় চরাঞ্চল প্রতি বছরই সাইক্লোন, ঘুর্নিঝড়, বন্যা ও
জ্বলোচ্ছাস প্রভৃতি নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত হয়। কিন্তু চরাঞ্চলের
প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো এসব দুর্যোগের তীব্রতা সহ্য করতে পারে  না। কারণ,
চরাঞ্চলের জন্য টেকসই করতে যে পরিমাণ বাজেট ব্যয় করে বিদ্যালয়ের গৃহ নির্মাণ
করা প্রয়োজন তা অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। ফলে বিদ্যালয় গৃহগুলো প্রাকৃতিক
দুর্যোগের কারণে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা মেরামত
করে পুনরায় পাঠোপযোগী করা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এতদ্ব্যাতীত, চরাঞ্চলে প্রাথমিক
বিদ্যালয়গুলোতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম।  ফলে প্রতিটি
বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বেশি। এসব কারণে, দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত
বিদ্যালয়গুলোর পাঠদান মাসের পর মাস বাধাগ্রস্ত হয়। চরাঞ্চল ঘুরলে এই রকম দৃশ্য
সচরাচর চোখে পড়ে। এই সমস্যার সমাধান করা আশু প্রয়োজন। এই জন্য উপকূলীয় এলাকার
পর্যায়ক্রমে সবগুলো প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ‘স্কুল কাম সাইক্লোন শেল্টার’ হিসেবে
নির্মাণ করা অতীব প্রয়োজন। আর নির্মাণকালে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে
যথাযথভাবে তদারকি করে কাজের মান নিশ্চিত করতে হবে।

নদীর একূল ভাঙ্গে,ওকূল গড়ে এই তো নদীর খেলা। বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার
মানুষের অন্যতম সমস্যা নদী ভাংগন।  নদী ভাংগনের কবলে পড়ে এক একটা প্রাথমিক
বিদ্যালয়কে চার পাঁচ বার অবস্থান বদলাতে হয়। এতে করে কোমলমোতি শিক্ষার্থীদের
শিক্ষা কার্যক্রমে ছেদ পড়ে। অভিভাবকরাও তেমন সচেতন নন। দারিদ্রতা তো আছেই। এসব
কারণে, চরের শিশুরা শিক্ষার আলো হতে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে বছরের পর বছর।  এই
সমস্যার রাতারাতি সমাধান নেই। তবে সক্ষমতা অনুযায়ী সরকারকে পর্যায়ক্রমে নদী
ভাংগন রোধে ব্লোক ফেলে প্রতিরোধ সৃষ্টি করতে হবে।

চরাঞ্চলের জীবন যাত্রা মূল ভূখন্ডের তুলনায় কষ্টসাধ্য। তাই ভাল কর্মকর্তা,
শিক্ষক ও কর্মচারীরা এসব এলাকায় চাকুরি করতে আগ্রহী হন না। যাদের দুর্গম
চরাঞ্চলে পদায়ন করা হয়, তারা চাকুরিতে মনোযোগের  চেয়ে বদলির জন্য দিন গুনতে
থাকেন। বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ভোলার প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে এটা একটি বড়
অন্তরায়। তাছাড়া নদী পথে নিয়মিত যাতায়াত করা ঝুকিপূর্ণও বটে। এমনকি অনেকে
হীনমন্যতায় ভোগে যে, ভোলা হচ্ছে শাস্তিমূলক পদায়ন। মনস্তাত্বিক এসব কারণে,
প্রাথমিক শিক্ষার সাথে জড়িতদের অনেকেই আন্তরিকতার সাথে চাকুরিতে মনোযোগ দিতে
পারেন না। এই সমস্যার সমাধান করা জরুরি। সরকার এসব এলাকায় পদায়নকৃত কর্মকর্তা
ও শিক্ষকদের জন্য পার্বত্য এলাকার ন্যায় ‘চর ভাতা’ প্রদান করলে অবস্থার উন্নতি
ঘটবে বলে আশা করা যায়।

চরের জীবন সংগ্রামে ভরা। নদী চরের জীবনের সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। নদীই অন্ন
যোগায়। আবার নদীই সর্বসান্ত করে। বিচিত্রতায় ভরা চরের জীবন। দারিদ্রতার
কষাঘাতে জর্জরিত এদের জীবন। শিক্ষার আলো হতে বঞ্চিত অধিকাংশ মানুষের জীবন। তাই
দারিদ্রতা আর অসচেতনতার কারণে ছেলে মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর বদলে নগদ লাভের আশায়
বিভিন্ন শ্রমঘন কাজে নিয়োগ করে। আমার ধারণা, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি শিশু
শ্রমিক রয়েছে উন্নয়নের ছোঁয়া বঞ্চিত চরাঞ্চলগুলোতে। এই অবস্থার উত্তরন না
ঘটিয়ে, চরাঞ্চলে কাঙ্ক্ষিত প্রাথমিক শিক্ষার আশা সুদূর পরাহত বলেই মনে হয়। এই
জন্য চরাঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে স্বতন্ত্র্য প্রকল্পের আওতায়
‘শিক্ষার বিনিময় খাদ্য’ কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে।

সচেতনতা সৃষ্টির বিকল্প নেই। চরাঞ্চলের মানুষের মাঝে সচেতনতার বড় অভাব।
বিভিন্ন ধরনের কুসংস্কারে অাচ্ছাদিত এদের জীবন।  বিশেষ করে, মেয়ে শিশুদের
শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অাছে বলে মনে করে না এখানের অনেক মানুষ। ফলে মেয়েদের
স্কুলমূখী করানো বেশ কঠিন। ১৫ বছরের আগে বিয়ে হয়ে যায় এমন বালিকার সংখ্যা
কমপক্ষে ৪৪%। বাল্য আর ১৮ বছরের আগে বিয়ে হয়ে যায় এমন হার প্রায় ৮৩%। বিয়ে
দিতে পারলেই যেন অভিভাবকরা বেঁচে যায়। কিন্তু এসব বাল্য বিবাহের অভিশাপে
চরাঞ্চলের সমাজ যে কতটা পিছিয়ে আছে, তা এসব এলাকার রাস্তাঘাট দিয়ে হাটলেই
অনুমান করা যায়। চরাঞ্চলের মেয়ে শিশুরা বলতে গেলে অধিকার বঞ্চিত। এদেরকে
সুরক্ষা দেয়ার জন্য শিক্ষার বিস্তার ঘটানোর কোন বিকল্প নেই। শিক্ষার শুরু তো
প্রাথমিক স্তরে। তাই নারী শিক্ষার প্রতি প্রাথমিক স্তরে বিশেষ নজর দেয়া সময়ের
দাবী।

দুর্গম চরাঞ্চলের যাতায়াত ব্যবস্থা প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি বড় বাঁধা।
এ প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হলে অন্তত চরাঞ্চলের অাভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা
উন্নত করা প্রয়োজন। স্কুল পর্যন্ত পৌঁছতে গ্রামীণ রাস্তায় কাঠের সাকোগুলো
অপসারণ করে পাকা কালবার্ট করা প্রয়োজন। খালের উপর বেড়িবাঁধ না থাকলে স্কুল পথে
তা নির্মান করা জরুরি। অনেক চরে লোকসংখ্যা কম। সরকারি হিসেব অনুযায়ী ঐসব চরে
স্কুল প্রাপ্য না হলেও সেখানে বিশেষ বিবেচনায় প্রয়োজনীয়তার নিরিখে স্কুল
প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
জোয়ার ভাটা চরাঞ্চলের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। ভরা কাটালের সময়ে জোয়ারের প্রকোপ বেশি
থাকে। ফলে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পায়। এতে চরেরর নীচু এলাকা পানির নীচে চলে যায়।
স্কুলের মাঠ এমনকি স্কুলের কক্ষ পর্যন্ত পানির নীচে তলিয়ে যায়। শিশুদের পাঠদান
কার্যক্রম ব্যাহত হয়। তাই অতি বৃষ্টি কিংবা অতি জোয়ারের ক্ষতি হতে শিক্ষা
কার্যক্রমকে রক্ষা করতে হলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন নির্মানের সময় খেয়াল
রাখতে হবে।

সর্বোপরি, চরাঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য সরকারের আলাদা প্রকল্প
গ্রহণ করা দরকার বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। স্কুল কেন্দ্রিক শিক্ষকদের ইনসেনটিভ
দেয়া হলে তারা আগ্রহের সাথে পাঠদান কার্যক্রমে মনোনিবেশ করবেন। শিশু শ্রম ও
শিশু বিয়ে বন্ধে আইনের প্রয়োগ আরো দৃঢ়তার সাথে করার প্রয়োজনীয়তাও অনুমেয়।
শিক্ষার আলোয়ে আলোকিত করতে হলে চরাঞ্চলের মানুষকে সচেতন করার জন্য সভা,
সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, নাটিকা,  জারীগান ও পথনাটকের আয়োজন করা যেতে পারে।

ফেইসবুকে আমরা

পুরনো সংখ্যা

সেপ্টেম্বর ২০১৭
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« আগষ্ট    
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০