December 15, 2017

মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণে সমস্যা এবং সমাধান

--- ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

মোঃ আঃ কুদ্‌দূস, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, বোরহানউদ্দিন, ভোলা।

প্রাথমিক শিক্ষা আমাদের মৌলিক অধিকার। প্রাথমিক শিক্ষার নিশ্চিতকরণে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে। এখন, সময় এসেছে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণের। মানসম্মত শিক্ষা বলতে বুঝায়A quality education provides the outcomes needed for individual communities and societies to prosper. It allows schools to align and integrate fully with their communities and across a range of services across sectors designed to support the educational development of their student.অর্থাৎ,“মানসম্মত শিক্ষা হচ্ছে এমন শিক্ষা যা ব্যক্তি, গোত্র ও সমাজের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় গুণাবলি অর্জন করার প্রয়াস যোগায়। এটা সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সম্পূর্ণরূপে একই মানের শিক্ষাদানে উদ্বুদ্ধ করে এবং সকল বিভাগের সমন্বিত সহায়তায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মানোন্নয়নে ভূমিকা পালন করে।” একজন শিক্ষার্থীদের পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল অর্জনের পর যখন তার নিকট হতে শিখনফল অর্থাৎ বাস্তবজ্ঞান অর্জনে ঘাটতি দেখতে পাই, তখনই আমরা বুঝতে পারি মানসম্মত শিক্ষা অর্জিত হয়েছেহয় নি। আমাদের দেশে, বিশেষ করে, প্রাথমিক স্তরে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কতিপয় অন্তরায় নিয়ে আমারা এই নিবন্ধে আলোকপাত করতে চাই।

নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা: জেলা শহরে নিয়োগ পরীক্ষা হয়। যাতে করে এক শ্রেণির টাউট লোকের প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ থাকে। যদিও পরীক্ষার হলে মোবাইল ফোন নেয়ার বিধান নাই তথাপিও বিভিন্ন কেন্দ্রে নিয়োগ প্রার্থীরা নানা কৌশলে মোবাইল ফোন নিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রবেশ করে। এছাড়া পরীক্ষা চলাকালীন প্রশ্নপত্র হলের বাইরে পাঠানোর সাথে জড়িত সক্রিয় চক্রের সহায়তায় প্রশ্নপত্র বাইরে চলে আসে। তখন পরীক্ষার কেন্দ্রর বাইরে অবস্থানরত Expertদ্বারা উত্তর সমাধানপূর্বক মোবাইলে ক্ষুদে বার্তায় ভিতরে পাঠানো হয়। যাতে করে অনেক অযোগ্য নিয়োগ প্রার্থীরা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় এবং চাকুরি পেয়ে যায়। আর ভাল Student পরীক্ষায় ভাল করতে পার না।

সুপারিশ: ১. পরীক্ষার হলে Jammerব্যবহার নিশ্চিত করা। যেখানে Mobile Network কাজ করে না।

২. প্রশ্নপত্রের সাথে সাথে উত্তরপত্র সেট কোড এর বৃত্ত ভরাট করে দেওয়া।

৩. মেধাবী শিক্ষার্থী নিয়োগ দিতে না পারলে মানসম্মত শিক্ষা অর্জন সম্ভব নয়। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নিয়ে একটি প্যানেল তৈরি, তার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ প্রদান করতে হবে। কেননা চাকরি পাবার পর প্রশিক্ষণ প্রদানে একদিকে যেমন সরকারি অর্থ অপচয় হয়অপর দিকে শিক্ষার্থীরা এ শিক্ষকের কাছ থেকে প্রাপ্ত সেবা হতে বঞ্চিত হয়। তাই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ দানে পূর্বশর্ত।

প্রধান শিক্ষকের কাজের চাপ কমিয়ে আনা: বর্তমানে প্রধান শিক্ষক অনেক বিভাগীয় কাজ করতে হয়। নিজস্ব বিভাগের বাইরেও তাদেরকে নিয়ে ভোটার তালিকা হালনাগাদ, ভোট গ্রহণ, বিভিন্ন জরিপ কার্যক্রমসহ তদন্ত ও অন্যান্য সামাজিক কাজে নানামূখী কাজেব্যস্ত থাকতে হয়। বিধায় তিনি বিদ্যালয়টি যথাযথভাবে পরিচালনা করতে পারেন না। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক যদি না থাকেন তবে সহকারী শিক্ষকগণ ভালভাবে ক্লাস নেন না। কাজেই প্রধান শিক্ষককে কাজের চাপ কমিয়ে এনে তাকে বিদ্যালয়কেন্দ্রিকবেশি সময় দেয়ার সুযোগ করে দেয়া প্রয়োজন।

সুপারিশ: প্রতিটি বিদ্যালয়ে একজন অফিস সহকারী নিয়োগ করা। যিনি দাপ্তরিক চিঠিপত্র তৈরী করবেন এবং যাবতীয় দায়িত্ব পালন করবেন।

অবকাঠামোগত ভবন সমস্যা: জাতীয়করণকৃত প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বেশীর ভাগ বিদ্যালয় ৩ কক্ষ বিশিষ্টি। এসব স্কুল ২ (দুই) শিফটে পরিচালিত হয়। আবার কক্ষগুলো আকারে ছোট। ৪০ জন শিক্ষার্থীর বেশী বসতে দেয়া যায় না। ০৩টি কক্ষের ১টিতে অফিস কক্ষ অন্য ২টিতে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সেক্ষেত্রে প্রাক্‌-প্রাথমিক শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কোন কক্ষ থাকে না। যদিও সবচেয়ে ভালো কক্ষটি প্রাক-প্রাথমিক শিশুদের জন্যে নির্বাচন করার কথা থাকলেও বাস্তবে শ্রেণি কক্ষের অপ্রতূলতার কারণে জাতীয়করণকৃত বিদ্যালয়ে তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। ফলে কোমলমোতি শিশুরা বিদ্যালয়ে এসেই একটি নিরানন্দ পরিবেশে পাঠে প্রবেশ করে। ফলশ্রুতিতে স্কুলের প্রতি তাদের অনীহা সৃষ্টি হয়। প্রতিটি বিদ্যালয়ে কমপক্ষে ৬টি কক্ষ বিশিষ্ট ভবন থাকা প্রয়োজন।

শিক্ষক সংখ্যা বৃদ্ধি করার সুপারিশ: আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অনুপাত সংখ্যা আন্তর্জাতিক অনুপাতের চেয়ে অপ্রতুল।  প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক কমপক্ষে ৫/৬টি ক্লাস করে থাকেন। একজন শিক্ষকের পক্ষে প্রতিদিন ৫/৬ শ্রেণিকার্যক্রম Lesson Plan ও উপকরণসহ পরিদর্শণ করা প্রায় অসম্ভব। ফলে শিক্ষক যেমন মানসম্মত শিক্ষা দিতে পারে না অপর দিকে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করতে পারেন না। অর্থাৎ শিখনফল বা বাস্তবতাভিত্তিক ফলাফল অর্জন করতে ব্যর্থ হন। কাজেই একজন শিক্ষক যদি প্রত্যহ সর্বোচ্চ ৩টি করে ক্লাস নেন, তবে তিনি মানসম্মতভাবে পাঠদান করতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস। ফলে প্রতিটি বিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর আন্তর্জাতিক অনুপাত ঠিকরেখে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন। এছাড়াও অধিক ক্লাস নেয়ার চাপ থাকায় শিক্ষকগণ আনন্দের মাধ্যমে পাঠদান করতে পারেন না। নিজের মনে আনন্দ না থাকলে শিশুকে কীভাবে আনন্দ দিবেন? তাই একজন শিক্ষকের যেন  প্রতিদিন সর্বাধিক ০৩টির বেশী শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করতে না হয় সেদিকটি বিবেচনায় নেয়া দরকার।

সহ শিক্ষাক্রমিক কার্যাবলির প্রাধান্য:আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের রুটিনে সংগীত, শারীরিক শিক্ষা, চারু-কারু বিষয়গুলো অন্তভূক্ত থাকলেও এই সকল বিষয় পাঠদান করার মত শিক্ষক আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে নেই বললেই বলে। শিশুর নান্দনিক (সৃজনশীল) বিকাশ লাভে এসব বিষয়ের পাঠদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহপাঠক্রমিক কার্যক্রমের অনুপস্থিতিতে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

সুপারিশ: এ সকল বিষয়ের জন্য প্রতি বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন। এ সব বিষয়ের শিক্ষক নিয়োগ দিলে এ বিষয়গুলোর প্রতি শিক্ষার্থীর আগ্রহ বাড়বে।

মিড ডে মিল চালুকরণ: শহরের বিদ্যালয়গুলোর তুলনায় গ্রাম অঞ্চলে প্রতিবছর ২০% শিশু ঝড়ে পরে এবং তারা বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা হতে বঞ্চিত হয়ে জাতির জন্য সম্পদ না হয়ে সমাজের বোঁঝা হয়ে দাঁড়ায়। গ্রামীণ প্রত্যন্ত জনপদের বিদ্যালয়গুলোতে অধ্যয়নরত কোমলমোতি শিশুরা না খেয়ে দীর্ঘসময় বিদ্যালয়ে অবস্থান করে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে ‘মিড ডে মিল’ চালু করলে শিশুরা আনন্দের সাথে পাঠ গ্রহণ করবে এবং নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত হবে। এতে করে ঝড়ে পড়া শিশুদের হার হ্রাস পাবে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার সমাজের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্বচ্ছল ব্যক্তি, শিক্ষানুরাগী, বিভিন্ন দাতা সংস্থা এবং এসএমসি এর আর্থিক সহায়তা নিয়ে প্রতিটি বিদ্যালয়ে ‘মিড ডে মিল’ কার্যক্রম চালু করতে পারেন। এতে ঝড়ে পড়ার (Drop Out)হারএবং বিদ্যালয় ত্যাগের হার দ্রুত হ্রাস পাবে। ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা দুপুরের বিরতির পরবর্তী ক্লাসসমূহে মনোযোগ দিতে সক্ষম হবে।

শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিতরকণ: উপজেলা রিসোর্স সেন্টারের মাধ্যমে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে শিক্ষকদের দক্ষ করে গড়ে তোলা এবং প্রশিক্ষণলব্দ জ্ঞান শিক্ষকগণ বিদ্যালয়ে ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রয়োগ করবেন। এ ব্যাপারে শিক্ষকগণের জবাবদিহিতা থাকা প্রয়োজন। প্রশিক্ষণলব্দ জ্ঞান প্রয়োগ ব্যবস্থা সুচারূরূপে করা হলে তাকে জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসা সহজতর হবে।

শিক্ষকদের প্রাইভেট কোচিং বাণিজ্য বন্ধ ঘোষণা এবং বাজারের গাইড বই বন্ধ: শিক্ষকগণ প্রাইভেট পড়ানোর বদ অভ্যাসের ফলে বিদ্যালয়ে ভালোভাবে পাঠদান করেন না। আজকাল অধিকাংশ শিক্ষকগণ কোচিং বাণিজ্যের সাথে জড়িত, যা মানসম্মত শিক্ষার অন্তরায়। শিক্ষকের মন বিদ্যালয়ে না থেকে কোচিং-প্রাইভেট এ সবের দিকে থাকায় বিদ্যালয়ে ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের আন্তরিকভাবে পাঠদান করছেন না। এ বিষয়ে আইন করে শিক্ষকদের প্রাইভেট কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করার ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষার প্রাথমিক স্তরটি বুনিয়াদী শিক্ষা। শিক্ষার এই ভিত্তিস্তরে যাতে কোন গাইড বা নেট বই কোমলমোতি শিক্ষার্থীদের সুকুমার ভিত্তিকে সমূলে বিনষ্ট করতে না পারে সেজন্য আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করা সময়ের অপরিহার্য দাবী।

সর্বোপরি প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের আচরণগত পরিবর্তন আনয়ন জরুরি। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষকদের আচরণের পরিবর্তন সাধন করা সম্ভব। তাই শিক্ষকদের বেশি বেশি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নতুন প্রজন্মের কোমলমোতি শিশুদের মাঝে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণের জন্য বিদ্যালয়ের পরিবেশ, শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের আচরণ, মন-মানসিকতা ও চিন্তার জগতে পরিবর্তন আনয়ন করতে হবে। এই বিষয়সমূহ নিশ্চিত করা গেলেই মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তার ঘটানো সম্ভব হবে।

 

ফেইসবুকে আমরা

পুরনো সংখ্যা

ডিসেম্বর ২০১৭
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« নভেম্বর    
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১